বুলন্দ হিম্মত: যে গুণটি একজন  দায়ীর চাই -ই- চাই

164

মাওলানা মাহমুদুল হাসান  ।।

একজন দায়ীকে অনেক গুণে গুণান্বিত হতে হয়। দায়ীর অন্যতম একটি গুণ ও বৈশিষ্ট্য হল, বুলন্দ হিম্মত ও উচ্চ মনোবল। কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে,

وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ

অর্থ: তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমার দিকে দৌড়াও।

অন্য আয়াতে এরশাদ হয়েছে, سَابِقُوا  অর্থ: তোমরা প্রতিযোগিতা করো।

আরেক আয়াতে এরশাদ হয়েছে, فَإِذَا فَرَغْتَ فَانصَبْ

অর্থ: যখন আপনি অবসর হোন, আল্লাহর দিকে মনেনিবেশ করুন।

এরশাদ হয়েছে, يَا يَحْيَى خُذِ الكِتَابَ بِقُوَّةٍ

অর্থ: হে ইয়াহইয়া! আপনি কিতাবকে মজবুতভাবে আকঁড়ে ধরুন।

পবিত্র কুরআনের এ সকল আয়াত মুমিনদেরকে হিম্মত ও উচ্চ মনোবলসম্পন্ন, কর্মতৎপর, উদ্যমী ও সাহসী হওয়ার উপদেশ দেয়। অলস, অকর্মণ্য, অক্ষম ও দুর্বলমনা- এগুলো কখনো মুমিনের বিশেষত কোনো দায়ীর বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।

পৃথিবীর সবচেয়ে বাস্তবসম্মত নাম

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র বাণীতেও হিম্মত ও উচ্চমনোবলের প্রশংসা করা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

أحب الأسماء إلى الله تعالى: عبد الله وعبد الرحمن، وأصدقها: حارث وهمام

অর্থ: আল্লাহ তায়ালার নিকট সবচেয়ে প্রিয় নাম হলো আব্দল্লাহ ও আব্দুর রহমান। এবং সবচেয়ে বাস্তব সম্মত ও সত্যবাদী নাম হলো হারেস ও হাম্মাম।

হাম্মাম অর্থ পেরেশান। হারিস অর্থ চাষী।  মানব জীবনের সাথে এই দুই নামের গভীর সম্পর্ক। মানুষ সব সময় বিভিন্ন চিন্তা ও পেরেশানিতে থাকে। সব বিষয়েই তার পেরেশানি থাকে। বিশেষভাবে তার পেরেশানি থাকে বেশি রুজির ব্যাপারে। রুজির জন্য দৌড়ঝাপ করে, চাষাবাদ করে বা ব্যবসা বাণিজ্য করে মানুষ অর্থ উপার্জন করে। আর এ উভয় নামই পরিশ্রম করতে ও ধারাবাহিকভাবে কাজে কর্মে লেগে থাকতে ‍উদ্বুদ্ধ করে।

যে নির্দেশের পর রাসূলের ঘুম উড়ে গেছে

নবুওয়াতের শুরুলগ্নে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সম্বোধন করে বলা হয়েছে,

قُمْ فَأَنذِرْ يَا أَيُّهَا المدَّثِّرُ

অর্থ: হে কম্বলে আবৃত ব্যক্তি! আপনি উঠুন। অতপর লোকদের ভীতিপ্রদর্শন করুন।

আরো এরশাদ হয়েছে,

قُمِ اللَّيْلَ إِلاَّ قَلِيلًا يَا أَيُّهَا المزَّمِّلُ

অর্থ: হে কম্বল মুড়ি দেনেওয়ালা ব্যক্তি! আপনি রাতের বেলা দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ুন। তবে অল্প সময় বিশ্রাম করুন।

এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর থেকে যখন তাঁকে ঘুমের জন্য ডাকা হতো, তিনি তার অবস্থার ভাষায় বলতেন, ঘুমের সময় শেষ হয়ে গেছে।

যিলালুল কুরআনের গ্রন্থকার  বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝলেন, আর ঘুমের সুযোগ হবে না। এখন থেকে অনেক দায়িত্ব এসে গেছে। বড় কঠিন দায়িত্ব। লাগাতার মেহনত মুজাহাদাহ করতে হবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলা হয়েছে, قُمِ –  নামাজে দাড়ান। এরপর থেকে তিনি দীর্ঘ তেইশ বছর যাবত রাতে দাড়িঁয়ে নামাজ পড়েছেন।

প্রকৃতপক্ষে যে নিজের সুখ শান্তির জন্য জীবন-যাপন করে সে তো খুব আরামেই জীবন-যাপন করতে পারে। কিন্তু যে মহান ব্যক্তি উম্মতের গুরুভার দায়িত্ব বহন করে, তার আবার কিসের ঘুম? কোথায় আরামের বিছানা? কিসের শান্তির জীবন? ভোগ বিলাসের সুযোগ কোথায়?

নেক কাজে পরিশ্রম করাই হিম্মত ও উঁচু মনোবলের সারকথা

নেক কাজে পরিশ্রম করাই হিম্মত ও উঁচু মনোবলের সারকথা। হিম্মত ও উচুঁ মনোবলের দাবি,  নেককাজের সকল অধ্যায়ে চেষ্টা মেহনত করা। এ বিষয়টাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো সুন্দরভাবে ব্যাক্ত করেছেন।

قال أبو ذر: على كل نفس في كل يوم طلعت فيه الشمس صدقة منه على نفسه. قلت: يا رسول الله، من أين أتصدق وليس لنا أموال؟ قال: “لأن من أبواب الصدقة التكبير، وسبحان الله، والحمد لله، ولا إله إلا الله، وأستغفر الله، وتأمر بالمعروف، وتنهى عن المنكر، وتعزل الشوكة عن طريق الناس والعظم والحجر، وتهدي الأعمى، وتسمع الأصم والأبكم حتى يفقه، وتدل المستدل على حاجة له قد علمت مكانها، وتسعى بشدة ساقيك إلى اللهفان المستغيث، وترفع بشدة ذراعيك مع الضعيف، كل ذلك من أبواب الصدقة منك على نفسك

অর্থ: আবুযর রা. বলেন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন , প্রতিদিন মানুষের উপর নিজের জন্য সদকাহ করা আবশ্যক হয়।

আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কোত্থেকে ছদকা করবো আমাদের তো এত সম্পদ নেই?

তিনি বললেন, আল্লাহু আকবার বলা ছদকা। সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আসতাগফিরুল্লাহ বলা ছদকাহ। সৎকাজের আদেশ করা ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা ছদকাহ। মানুষের চলা চলের রাস্তা থেকে কাঁটা, হাড্ডি, পাথর সরিয়ে দেয়া ছদকাহ। অন্ধকে রাস্তা বলে দেয়া, বধির ও বোবাকে যেভাবে সে বুঝে সেভাবে বুঝিয়ে দেওয়া দেয়া ছদকা। কোন প্রয়োজন সম্পর্কে যে জানতে চায় আর তুমি সে ব্যাপারে জানো, তাকে তার পদ্ধতি বলে দেয়া ছদকা। দুঃখী ফরিয়াদি ব্যক্তির জন্য মেহনত করে উপার্জন করা ছদকা। দুর্বল ব্যক্তিকে উভয়হাত মজবুত করে সহায়তা করা ছদকা। এ সকল ছদকাই তোমার পক্ষ থেকে তোমার নিজের জন্য।

নেক কাজে অটলতা উচ্চমনোবলের প্রকাশক্ষেত্র

হিম্মত বা উচ্চমনোবলের একটা প্রকাশক্ষেত্র হল, নেক কাজে অটল থাকা। এটাকে বলা হয় ইস্তিকেমাত।  এটা প্রত্যেক জমানায় অনুসরণীয় ব্যক্তিদের গুণ।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমল সম্পর্কে হযরত আয়েশা র. কে জিজ্ঞাসা করা হল।

তিনি বললেন, كان عمله ديمة، وايكم يستطيع ما كان النبي – صلى الله عليه وسلم – يستطيع؟

অর্থ: তিনি যে আমল করতেন, সে আমল অধ্যবসায়ের সাথে করতেন। নিয়মিত করতেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা করতে সক্ষম ছিলেন তোমাদের কে আছে তা করতে সক্ষম হবে?

কোন কাজকে বিলম্বিত করা, করবো করছি করে কাজ পেছাতে থাকা-  উদ্যমি উচ্চমনোবল সম্পন্ন দায়ীর গুণ হতে পারে না।

অক্ষমতা ও আলস্য থেকে পানাহ চাইতে হবে

জীবনে লক্ষ্যে পৌঁছার অন্যতম চালিকা শক্তি বুলন্দ হিম্মত। আল্লাহ তায়ালার নিকট হিম্মত বুলন্দির দোয়া করতে হবে। অক্ষমতা ও অলসতা থেকে পানাহ চাইতে হবে।

যখন শক্তি দমে যায়, মনোবল দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন আমাদের কর্তব্য, আল্লাহর নিকট পানাহ চাওয়া।রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসব অবস্থায় আমাদের শিখিয়েছেন-

اللهم إني أعوذ بك من العجز والكسل

হে আল্লাহ! আপনার নিকট অক্ষমতা ও আলস্য থেকে পানাহ চাই।

 

লেখক: শিক্ষক, বিক্রমপুর বাদশাহী মাদরাসা