হজ্ব : হাদীস ও আছারের আলোকে-[দুই]

75

[গত পর্বের পর]

মুফতি মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া ।।

উমরার পদ্ধতি:

উমরার ফরয দুটি

১। উমরার ইহরাম করা। অর্থাৎ উমরার নিয়তে তালবিয়া পাঠ করা।

২। বাইতুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করা ।

উমরার ওয়াজিব দুটি

১। সাফা-মারওয়ার মাঝে সায়ী করা।

২। মাথার চুল মুণ্ডানো বা কটা।

উমারা আদায়ের পদ্ধতি হল, মীকাত থেকে শুধু উমরার ইহরাম করবে। এরপর মক্কা পৌঁছে বাইতুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করবে। অতপর সাফা-মারওয়ার সায়ী করবে। তারপর মাথার চুল মুণ্ডিয়ে বা ছোট করে হালাল হয়ে যাবে।

মাসআলা : উমরার তাওয়াফ ও যে তাওয়াফের পর সায়ী আছে সেই তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে রমল  করা অর্থাৎ বীরদর্পে কাঁধ দুলিয়ে কিছুটা দ্রুত বেগে চলা সুন্নত। তদ্রƒপ পুরো তাওয়াফে ইজতিবা করা (পরিধেয় চাদর ডান বগলের নীচে দিয়ে বের করে বাম কাঁধের উপর রাখা) সুন্নত। তবে এ দু’টি বিষয়-রমল ও ইজতিবা শুধু পুরুষের জন্য সুন্নত। -মানাসিক ১২৯; আদ্দুররুল মুখতার ২/৪৯৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২৫

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, হজ্ব ও উমরায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাওয়াফ করতেন তখন প্রথম তিন চক্করে রমল করতেন। বাকি চার চক্করে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেন। এরপর দু’ রাকাত নামায পড়তেন। এরপর সাফা-মারওয়া মাঝে সায়ী করতেন। -সহীহ মুসলিম ১/৪১০

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, জিঈররানা নামক স্থান থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ উমরা করেছেন। তাঁরা তাওয়াফকালে ‘রমল’ করেছেন এবং পরিধেয় চাদর (ডান কাঁধ খালি রেখে) বগলের নিচ দিয়ে বের করে বাম কাঁধের উপর রেখেছেন। -সুনানে আবু দাউদ ১/২৫৭; মুসনাদে দারেমী, হাদীস ১৯৭৪; জামে তিরমিযী ১/১৭৪

মাসআলা : মহিলাদের জন্য রমল নেই।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, মহিলাদের জন্য ‘রমল’ করার বিধান নেই। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ১৩১১১

মাসআলা : সকল তাওয়াফের পর দুই রাকাত নফল নামায পড়া ওয়াজিব। তাওয়াফ নফল হোক বা ফরয। আর এই দুই রাকাত নামায মাকামে ইবরাহীমের পিছনে পড়া মুস্তাহাব।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কায় এলেন তখন বাইতুল্লাহর চারপাশে সাত বার তাওয়াফ করলেন। তাওয়াফ শেষে মাকামে ইবরাহীমের পেছনে দু’ রাকাত নামায পড়লেন। এরপর সাফা-মারওয়ার দিকে গেলেন।… -সহীহ বুখারী ১/২২০

মাসআলা : মাকামে ইবরাহীমের পিছনে পড়া সম্ভব না হলে মসজিদে হারামের যে কোনো স্থানে এই দুই রাকাত নামায পড়া যাবে।

মাসআলা : তাওয়াফ পরবর্তী দুই রাকাত নামায তাওয়াফের পর অবিলম্বে আদায় করা উত্তম। বিনা ওজরে বিলম্বে পড়া মাকরূহ। তবে মাকরূহ ওয়াক্ত হলে পরে পড়বে। -রদ্দুল মুহতার ২/৪৯৯, মানাসিক ১৫৫, গুনইয়াতুন নাসিক ১১৬

মাসআলা : একাধিক তাওয়াফ করে পরবর্তী দুই রাকাত নামাযকে একত্রে পড়া মাকরূহ।

নাফে‘ রাহ. থেকে বর্ণিত, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. একত্রে একাধিক তাওয়াফ করা অপছন্দ করতেন। তিনি বলেন, প্রত্যেক সাত চক্করে (অর্থাৎ এক তাওয়াফের পর) দুই রাকাত নামায পড়া জরুরি। তিনি একত্রে দুই তাওয়াফ করতেন না। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ৯০১২

মাসআলা : তাওয়াফের পরের সময় যদি মাকরূহ ওয়াক্ত হয়ে থাকে তবে মাকরূহ ওয়াক্ত শেষ হওয়ার পর একাধিক তাওয়াফের নামায একত্রে আদায় করা যাবে। -গুনইয়াতুন নাসিক ১১৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২৭

আতা রাহ. বলেন, উমন রা, ফজরের পর তাওয়াফ করেন। অতপর সওয়ার হয়ে তুয়া নামক স্থানে এসে অবতরণ করেন। এরপর নামায পড়েন।… -মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ১৩৩২৬

হযরত মিছওয়ার ইবনে মাখরামা রা. ফজরের পর একত্রে তিন তাওয়াফ করতেন এবং সূর্যোদয়ের পর প্রত্যেক তাওয়াফের জন্য দুই রাকাত নামায আদায় করতেন। তিনি আসরের পরও অনুরূপ করতেন। অতপর সূর্যাস্তের পর প্রত্যেক তাওয়াফের জন্য দুই রাকাত নামায আদায় করতেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ১৩৪২২

উমরার সায়ী

‘সাঈ’ হল, সাফা-মারওয়ার মাঝে সাত চক্কর দেওয়া। সাফা থেকে শুরু করে মারওয়াতে পৌঁছলেই এক চক্কর হবে। এরপর মারওয়া থেকে সাফাতে আসলে দ্বিতীয় চক্কর হবে। এভাবে সাফা-মারওয়ার মাঝে ৭ চক্কর পূর্ণ করতে হবে। সাঈর প্রথম চক্কর শুরু হবে সাফা থেকে আর সপ্তম চক্কর শেষ হবে মারওয়াতে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১২১৮

মাসআলা : সাঈর সময় সবুজ দুই পিলারের মধ্যবর্তী স্থান পুরুষের জন্য মধ্যম গতিতে দৌড়ে অতিক্রম করা মুস্তাহাব। কিন্তু মহিলাগণ দৌড়াবেন না। স্বাভাবিকভাবে হাঁটবেন। -সহীহ বুখারী, হাদীস ১৬৪৪

মাসআলা : সাঈ সমাপ্ত করার পর মাথা মুণ্ডিয়ে বা চুল ছোট করে এহরাম মুক্ত হয়ে যাবেন। এ পর্যন্ত উমরার কাজ শেষ হল। তামাত্তু হজ্বকারীগণ এখন থেকে হজ্বের এহরাম বাধার আগ পর্যন্ত বৈধ সব কাজ করতে পারবেন। অবশ্য হারামের এলাকায় সাধারণভাবে নিষিদ্ধ কাজসমূহ যেমন, শিকার করা ইত্যাদি তখনও নিষিদ্ধই থাকবে।

 

হজ্বের পদ্ধতি

হজ্বের ফরয তিনটি :

১। ইহরাম বাঁধা। ইতিপূর্বে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

২। উকূফে আরাফা।

৩। তাওয়াফে যিয়ারত।

হজ্বের ওয়াজিবসমূহ এই-

১। মুযদালিফায় অবস্থান করা

৫। সাফা-মারওয়ার মাঝে সায়ী করা।

২। নির্দিষ্ট দিনগুলোতে নির্ধারিত সময়ের ভেতর জামরাতে রমী তথা কংকর নিক্ষেপ করা।

৩। তামাত্তু ও কিরান হজ্ব আদায়কারীর জন্য দমে শোকর তথা হজ্বের কুরবানী।

৪। মাথার চুল মুণ্ডানো বা ছোট করা।

৬। মীকাতের বাহির থেকে আগত লোকদের ‘তাওয়াফে বিদা’ করা।

হজ্বের পাঁচ দিনের আমল

নিম্নে  ৮ যিলহজ্ব থেকে ১২ যিলহজ্ব পর্যন্ত হজ্বের পাঁচ দিনের আমলগুলোর কর্মপদ্ধতি ও সংশ্লিষ্ট মাসায়িল আলোচনা করা হচ্ছে :

প্রথম দিন ৮ যিলহজ্ব

আজ সূর্যোদয়ের পর সকল হাজ্বীকে ইহরাম অবস্থায় মিনা গমন করতে হবে। যোহর থেকে পরবর্তী দিনের ফজর পর্যন্ত মোট পাঁচ ওয়াক্ত নামায মিনায় পড়া এবং ৮ তারিখ দিবাগত রাত্রি মিনায় অবস্থান করা সুন্নত। -রদ্দুল মুহতার ২/৫০৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২৭

হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৮  যিলহজ্ব মিনায় গমন করলেন এবং সেখানে যোহর, আসর, মাগরিব, ইশা ও ফজর নামায আদায় করলেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ১৪৭৫৫

হজ্বের ইহরাম : ইফরাদ হজ্ব ও কিরান হজ্ব আদায়কারী হজ্বের ইহরাম পূর্ব থেকেই করে থাকে। তামাত্তু হজ্ব আদায়কারী আজ মিনায় যাওয়ার পূর্বে হজ্বের ইহরাম করবেন।

হযরত জাবির রা.  বলেন, যখন আমরা ইহরাম থেকে মুক্ত হলাম তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে আদেশ করলেন, আমরা যেন মিনার উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় ইহরাম করি। আমরা আবতাহ নামক স্থানে ইহরাম করলাম। -সহীহ মুসলিম ১/৩৯২

হজ্বের ইহরাম বাঁধার স্থান

মাসআলা : মহিলাগণ নিজ নিজ অবস্থান স্থল থেকেই ইহরাম বাঁধবে। পুরুষরাও হোটেল বা আবাস-স্থান থেকে ইহরাম বাঁধতে পারে। তবে পুরুষের জন্য সম্ভব হলে মসজিদে হারামে এসে নিয়ম অনুযায়ী ইহরাম বাঁধা ভালো।

ইসমাইল ইবনে আবদুল মালিক থেকে বর্ণিত, হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর রাহ. ৮ যিলহজ্ব স্বস্থান থেকে পায়ে হেঁটে বের হলেন, আমিও তার সঙ্গে বের হলাম। তিনি মসজিদে হারামে প্রবেশ করে দুই রাকাত নামায আদায় করলেন। অতপর মসজিদ থেকে বের হয়ে কাবার দিকে ফিরে তালবিয়া পাঠ করলেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ১৫৯৩১

মাসআলা  : হজ্বের ইহরামের পর থেকে ১০ তারিখ জামরা আকাবায় কংকর নিক্ষেপের পূর্ব পর্যন্ত তালবিয়া পড়তে থাকবে। কংকর নিক্ষেপের পর থেকে তালবিয়া বন্ধ হয়ে যাবে। -মানাসিক ২২৫; গুনইয়াতুন নাসিক ১৭০

হযরত ফযল ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামরা আকাবায় কংকর নিক্ষেপ করা পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করেছেন। -সহীহ মুসলিম ১/৪১৫

মিনায় অবস্থান না করা

মাসআলা : ৮ তারিখ দিবাগত রাতে যদি কেউ মিনায় অবস্থান না করে কিংবা এ তারিখে মোটেই মিনায় না যায় তাহলেও তার হজ্ব আদায় হয়ে যাবে। তবে মাকরূহ হবে। -মানাসিক ১৮৮-১৮৯; আহকামে হজ্ব ৬২

তাবু মিনার বাইরে হলে

মাসআলা : মিনায় জায়গা সংকুলান না হওয়ার কারণে মিনার এলাকার বাইরে বহু তাবু লাগানো হয়। যেহেতু এটি জায়গার সংকীর্ণতার ওজরে করা হয়ে থাকে তাই আশা করা যায়, এ সকল তাবুতে অবস্থানকারীরাও মিনায় অবস্থানের ফযীলত পেয়ে যাবে।

নির্ধারিত সময়ের আগেই মিনার উদ্দেশে রওয়ানা

মাসআলা : মিনায় রওয়ানা হওয়ার সময় হল ৮ তারিখ সূর্যোদয়ের পর। কিন্তু আজকাল ৭ তারিখ দিবাগত রাতেই মুআল্লিমের গাড়ি রওয়ানা হয়ে যায় এবং রাতে রাতেই মিনায় পৌঁছে যায়। যদিও ৮ তারিখ সূর্যোদয়ের পর রওয়ানা হওয়া নিয়ম এবং এটিই ভালো, কিন্তু অধিক ভিড়ের কারণে আগে চলে যাওয়া দোষের বিষয় নয়। -মানাসিক ১৮৮; গুনইয়াতুন নাসিক ১৪৬, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২৭

হাজ্জাজ রাহ. বলেন, আমি হযরত আতা রাহ.-কে ‘ইয়াওমুত তারবিয়া’র একদিন পূর্বে (অর্থাৎ ৭ তারিখে) মিনায় যাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি। তিনি তা দোষের বিষয় মনে করেননি। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ১৫৫৩৪

তাকবীরে তাশরীক

মাসআলা : ৯-১৩ যিলহজ্ব প্রত্যেক ফরয নামাযের পর তাকবীরে তাশরীক পড়া ওয়াজিব। তাই প্রত্যেক হাজ্বীকে এ বিষয়ে যত্নবান হতে হবে।

হযরত আলী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি যিলহজ্বের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরয নামাযের পর তাকবীরে তাশরীক পাঠ করতেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ৫৬৭৮

দ্বিতীয় দিন ৯ যিলহজ্ব

উকূফে আরাফা

৮ যিলহজ্ব সূর্য ঢলার পর থেকেই উকূফ করা সুন্নত। সূর্যাস্তের আগে আরাফায় পৌঁছে গেলে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উকূফ করা ওয়াজিব। সূর্যাস্তের আগে আরাফা ত্যাগ করা জায়েয নয়। আরাফায়া উকূফের প্রধান সময় ৯ যিলহজ্ব সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত। কিন্তু কেউ যদি এ সময়ের ভেতর আরাফায় পৌঁছতে না পারে তাহলে আগত রাতের সুবহে সাদিকের মধ্যে স্বল্প সময় আরাফার ময়দানে উপস্থিত থাকলেও এই ফরয আদায় হয়ে যাবে।

হযরত আবদুর রহমান ইবনে ইয়া‘মার রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘হজ্ব হল (উকূফে) আরাফা। যে ব্যক্তি আরাফার রাত (অর্থাৎ ৯ তারিখ দিবাগত রাত) পেল তার হজ্ব পূর্ণ হল।’ -সুনানে নাসাঈ ২/৩৭

অন্য হাদীসে এসেছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে আরাফায় রাতের কিছু অংশ অবস্থান করেছে তার হজ্ব পূর্ণ হয়েছে আর যে তা করল না তার হজ্ব হয়নি। অতএব সে উমরা করে ইহরাম থেকে মুক্ত হবে এবং পরবর্তী বছর পুনরায় হজ্ব করবে। -সুনানে দারাকুতনী ২/২৪১; গুনইয়াতুন নাসিক ১৫৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২৯; আহকামে হজ্ব ৬৩

হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য ঢলার পর ক্বসওয়া নামক উটনীতে আরোহণ করে রওনা হয়েছেন এবং বাতনে ওয়াদি অর্থাৎ আরাফায় এসে খুতবা দিয়েছেন। অতপর সেখানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করেছেন। -সহীহ মুসলিম ১/৩৯৭

যোহর ও আসর একত্রে পড়া

মাসআলা : মসজিদে নামিরার জামাতে অংশগ্রহণ করতে পারলে যোহর ও আসর একত্রে ইমামের পিছনে আদায় করবে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফার দিন সকালে ফজর নামায পড়লেন এবং মিনা থেকে আরাফার উদ্দেশে রওনা হলেন। আরাফায় পৌঁছে নামিরাতে অবস্থান করলেন।      নামিরা হল আরাফার ঐ স্থান যেখানে ইমাম অবস্থান করেন। অতপর যখন যোহরের সময় হল তখন দ্রƒত নামায আদায় করলেন এবং যোহর ও আসর একত্রে পড়লেন। অতপর খুতবা দিলেন। খুতবা শেষে আরাফার মাওক্বিফের দিকে রওনা হলেন এবং সেখানে উকূফ (অবস্থান) করলেন। -সুনানে আবু দাউদ ১/২৬৫

উকূফে আরাফার করণীয়

উত্তম হল, তাঁবুর বাইরে খোলা আকাশের নিচে এসে কিবলামুখী হয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দুআ করা। -সহীহ মুসলিম ১/৩৯৮

হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটে আরোহণ করে মাওক্বিফে এলেন।… অতপর সূর্যাস্ত পর্যন্ত কিবলামুখী হয়ে এখানে উকূফ করেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ১৫৬২২

সূর্যাস্তের পূর্বে আরাফা থেকে বেরিয়ে যাওয়া

অনেকে সূর্যাস্তের আগেই মুযদালিফার উদ্দেশে রওনা হয়ে যায়। এরূপ হয়ে গেলে কর্তব্য হল পুনরায় আরাফায় ফিরে আসা। অন্যথায় দম দিতে হবে। -মানাসিক ২১০; গুনইয়াতুন নাসিক ১৬০; রদ্দুল মুহতার ২/৫৫২

বিখ্যাত তাবেয়ী হযরত হাছান রাহ. বলেন, ইমামের পূর্বে যে মুযদালিফায় পৌঁছবে তার উপর দম আসবে।

অন্য বর্ণনায় আছে, আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর বলেন, ইমাম সূর্যাস্তের পর আরাফা থেকে রওনা হবে। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ১৫৪১৭

৯ তারিখ সূর্যাস্তের আগে আরাফায় পৌঁছতে না পারলে

কেউ যদি ৯ তারিখ সূর্যাস্তের আগে আরাফার ময়দানে কোনো কারণে পৌঁছতে না পারে তবে সুবহে সাদেক হওয়ার আগে কিছু সময়ের জন্য আরাফায় অবস্থান করলেও ফরয আদায় হবে। আর এ কারণে  দম বা অন্য কিছু ওয়াজিব হবে না। তবে মূল সময় আরাফায় না পৌছার কারণে অনেক ফযীলত থেকে বঞ্চিত হবে। -মানাসিক ২০৫-২০৬; গুনইয়াতুন নাসিক ১৫৯

হযরত আবদুর রহমান ইবনে ইয়া‘মার রা. থেকে বর্ণিত, নজদের কিছু লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এল। তখন তিনি আরাফায় অবস্থান করছিলেন। তিনি এক ব্যক্তিকে এই মর্মে ঘোষণা করতে বললেন যে, হজ্ব হল আরাফা। যে ব্যক্তি জমা করার রাতে (৯ তারিখ দিবাগত রাত) ফজরের পূর্বে আরাফায় পৌঁছল সে হজ্ব পেল। -জামে তিরমিযী ১/১৭৮

মাসআলা : আরাফার ময়দানে ‘বাতনে উরানা’ নামক একটি স্থান রয়েছে। মসজিদে নামিরার পশ্চিমের কিছু অংশ এর অন্তর্ভুক্ত। এখানে উকূফ গ্রহণযোগ্য নয়।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘পূর্ণ আরাফা উকূফের স্থান তবে তোমরা ‘বতনে উরানা’ থেকে উপরে চলে আসবে।’ -মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস ১৪০৬৩

মুযদালিফার উদ্দেশে রওনা

মাসআলা : আরাফার ময়দান থেকে সূর্যাস্তের পর মাগরিবের নামায না পড়ে মুযদালিফার উদ্দেশে রওয়ানা হতে হবে। সূর্যাস্তের পর বিলম্ব না করাই শ্রেয়। -রদ্দুল মুহতার ২/৫০৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩০

হযরত উসামা ইবনে যায়েদ রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফার উদ্দেশে রওনা হলেন। পথিমধ্যে এক উপত্যকায় নেমে ইস্তিঞ্জা সারলেন এবং অযু করলেন। আমি বললাম, নামায! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নামায সামনে। এরপর মুযদালিফায় এসে পূর্ণ অযু করলেন এবং ইকামত দিয়ে মাগরিব নামায আদায় করলেন। -সহীহ বুখারী ১/২২৭

৯ তারিখ দিবাগত রাত্রির মাগরিব ও ইশা

মাসআলা : আজ মাগরিব ও ইশা ইশার ওয়াক্তে মুযদালিফায় গিয়ে পড়তে হবে। কেউ যদি মুযদালিফায় পৌঁছার আগেই     রাস্তায় মাগরিব-ইশা পড়ে নেয় কিংবা মুযদালিফায় পৌঁছার আগে শুধু মাগরিব পড়ে তবে উভয় ক্ষেত্রে মুযদালিফায় পৌঁছে পুনরায় মাগরিব-ইশা একত্রে পড়া জরুরি। -মানাসিক ২১৬, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩০, গুনইয়াতুন নাসিক ১৬৪

হযরত উসামা ইবনে যায়েদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফা থেকে রওনা হয়ে মুযদালিফায় পৌঁছলেন। অতপর মাগরিব ও ইশা একত্রে আদায় করলেন। -সহীহ মুসলিম ১/৪১৬

মাসআলা : ইশার ওয়াক্তের মধ্যে (সুবহে সাদিকের পূর্বে) মুযদালিফায় পৌঁছা সম্ভব না হলে পথিমধ্যে মাগরিব-ইশা পড়ে নিবে। এক্ষেত্রে মুযদালিফায় পৌঁছার পর ইশার ওয়াক্ত বাকী থাকলে  এ দুই নামায পুনরায় পড়তে হবে। -তাবয়ীনুল হাকায়েক ২/২৮, আলবাহরুর রায়েক ২/৩৪২, আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৪০৪, তাতারখানিয়া ২/৪৫৮, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩০;  গুনইয়াতুন নাসিক ১৬৪

ইশার ওয়াক্তের পূর্বেই মুযদালিফা পৌঁছে গেলে

মাসআলা : যদি কেউ ইশার ওয়াক্তের পূর্বে মুযদালিফায় পৌঁছে যায় তবে সে তখন মাগরিব পড়বে না; বরং ইশার ওয়াক্ত হওয়ার পর মাগরিব-ইশা একত্রে আদায় করবে। -মানাসিক ২১৮;  আদ্দুররুল মুখতার ২/৫০৯; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ১৬৪

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাগরিবের নামায ইশার ওয়াক্তে আদায় করেছেন। -সহীহ মুসলিম ১/৪১৬; গুনইয়াতুন নাসিক ১৬৭; মানাসিক, মোল্লা আলী কারী পৃ. ২২০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩০; আদ্দুররুল মুখতার ২/৫০৮

মাসআলা : মুযদালিফায় দুই নামায একত্রে পড়ার জন্য জামাত শর্ত নয়। একা পড়লেও দুই নামায একত্রে ইশার সময় পড়বে। তবে নিজেরা জামাত করে পড়া ভালো। -মানাসিক ২১৪, গুনইয়াতুন নাসিক ১৬৩-১৬৪

মাসআলা : মুযদালিফায় রাত্রি যাপন করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা।

হযরত জাবির রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফায় এসে মাগরিব ও ইশার নামায আদায় করলেন। এরপর সুবহে সাদিক পর্যন্ত শয্যাগ্রহণ করলেন। -সহীহ মুসলিম ১/৩৯৮

৩য়  দিন ১০ যিলহজ্ব

উকূফে মুযদালিফা

মাসআলা : উকূফে মুযদালিফার সময় ১০ তারিখ সুবহে সাদিক থেকে সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত। সুবহে সাদিকের পর সামান্য কিছু সময় অবস্থান করে মুযদালিফা ত্যাগ করলেও ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। তবে সূর্যোদয়ের কিছু পূর্ব পর্যন্ত অপেক্ষা করা সুন্নত। -মানাসিক ২১৫, ২১৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩০; গুনইয়াতুন নাসিক ১৬৫

হযরত কাসেম রাহ. বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা.-কে বলতে শুনেছি, হজ্বের একটি সুন্নত এই যে, ফজরের নামায পড়ে মুযদালিফায় অবস্থান করবে। যখন (সূর্যোদয়ের পূর্বে) আলো ছড়িয়ে পড়ে তখন রওনা হবে। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ১৫৫৬৫

মাসআলা : উকূফে মুযদালিফা ওয়াজিব। তাই বিশেষ ওযর ব্যতীত নির্ধারিত সময়ে উকূফ না করলে দম ওয়াজিব হবে।

ইবরাহীম রাহ. বলেন, যে ব্যক্তি মুযদালিফার পাশ দিয়ে অতিক্রম করল অথচ তার জানা নেই যে, এখানে উকূফ করতে হয় ফলে সে উকূফ না করে মিনায় চলে গেল তাকে দম দিতে হবে। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ১৫৪৬৬

মাসআলা : ভিড়ের কারণে সূর্যোদয়ের আগে মুযদালিফায় পৌঁছা সম্ভব না হলে দম ওয়াজিব হবে না। -মানাসিক ২১৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩১; আদ্দুররুল মুখতার ২/৫১১

উকূফের স্থান

মাসআলা : মুযদালিফা ময়দানের যেকোনো অংশেই উকূফ করা যায়। তবে মসজিদে মাশআরে হারামের নিকট উকূফ করা উত্তম।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. নিজ পরিবারের দুর্বল ব্যক্তিদেরকে অগ্রসর করে দিতেন। তারা মুযদালিফায় এসে রাতে মাশআরে হারামের নিকটে অবস্থান করতেন এবং যতক্ষণ ইচ্ছা যিকিরে মশগুল থাকতেন।’ -মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ১৪০৭৫; সহীহ মুসলিম ১/৪১৮

মাসআলা : মুযদালিফার বাইরে মিনার দিকে ‘ওয়াদিয়ে মুহাস্সির’ নামক স্থানে উকূফ করা যাবে না। কারণ এখানে উকূফ করা নিষিদ্ধ। এ স্থানের উকূফ ধর্তব্য নয়। -গুনইয়াতুন নাসিক ১৬৭; মানাসিক, মোল্লা আলী কারী পৃ. ২২০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩০; আদ্দুররুল মুখতার ২/৫০৮

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, ‘বতনে মুহাসসির ব্যতীত পুরো মুযদালিফা উকূফ করার স্থান।’ -মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ১৪০৭২, ১৪০৭১

মাসআলা : অতিশয় বৃদ্ধ, নারী কিংবা অধিক পীড়িত ব্যক্তির জন্য মুযদালিফায় অবস্থান না করে আরাফা থেকে সোজা মিনায় চলে যাওয়ার অনুমতি আছে। এতে তাদের উপর দম বা কোনো কিছু ওয়াজিব হবে না। -মানাসিক ২১৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩১

উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা. বলেন, মুযদালিফার রাতে সওদা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট মিনায় চলে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অনুমতি দিলেন। কেননা সওদা ছিলেন তখন ভারী ও ধীর গতিসম্পন্ন। -সহীহ বুখারী ১/২২৮

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফার রাতে তাঁর পরিবারের দুর্বল ব্যক্তিদের সঙ্গে যাদের পূর্বেই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন আমি তাদের মধ্যে শামিল ছিলাম।’ -সহীহ বুখারী ১/২২৭

(চলবে, ইনশাআল্লাহ)