জামিয়া ইসলামিয়া মাহমুদিয়া: বরিশালের প্রসিদ্ধতম দ্বীনী বিদ্যাপীঠ

253

তারিক বিন মুজিব।।

জামিয়া ইসলামিয়া মাহমুদিয়া বরিশাল। মাহমুদিয়া মাদরাসা বা বেলতলা মাদরাসা নামে লোকমুখে প্রচলিত। কীর্তনখোলার পাড়ে শহরের বেলতলা, আমানতগঞ্জে অবস্থিত মাহমুদিয়া মাদরাসা বরিশাল বিভাগের কওমি মাদরাসাসমুহের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধতম নাম।

বৃটিশ উপনিবেশবাদের আগে বাংলা অঞ্চলের শিক্ষা ছিল মাদরাসা নির্ভর। বাংলাদেশে প্রায় ৮০ হাজার মাদরাসা থাকার বিবরণ পাওয়া যায়। বাংলাদেশের সমগ্র ভূমির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ছিল মাদরাসার জন্য ওয়াকফ করা। সেই ওয়াকফকৃত সম্পত্তি ইংরেজরা লা-খেরাজ বা নিষ্কর সম্পদ হিসেবে অধিগ্রহণ করে।

বাংলাদেশে দেওবন্দের ভাবধারায় গড়ে ওঠা প্রাচীন প্রতিটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পেছনে অনেক কুরবানী ছিল। বিখ্যাত প্রসিদ্ধ যেসব মাদরাসার নাম আজ মানুষের মুখে মুখে; অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়েই সেগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

১৯৪৭ সাল। দেশভাগের বছর। চরম উত্তেজনা সবখানেই। দেওবন্দে পড়তে যাওয়া বরিশালের চার কৃতি সন্তান স্থির করলেন দেশভাগকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় যে স্পৃহা বাংলা অঞ্চলের মানুষের মাঝে তৈরি হয়েছে তা কাজে লাগিয়ে দেশে একটি মাদরাসা করবেন। মাওলানা নেছার উদ্দীন, মাওলানা আবদুল মান্নান, মাওলানা আবদুল কাদির ও মাওলানা নূর আহমাদ- বরিশালের খ্যাতনামা এই তরুন চার আলেম পরামর্শের জন্য গেলেন তাদের শায়েখ হুসাইন আহমদ মাদানীর কাছে। মাদানী রহ. মাদরাসা প্রতিষ্ঠার কথা শুনে খুব খুশি হলেন এবং দেওবন্দের ছাত্র-উস্তাযদের ডেকে এই চারজনের জন্য দোয়া করতে বললেন।

বরিশালের ঐতিহ্যবাহী হাজী ওমর শাহ (বটতলা) মসজিদে ১৯৪৭ সালে তালিমের প্রাথমিক কাজ শুরু করা হয়। সে অঞ্চলের প্রখ্যাত বুযুর্গ আওলাদে রাসূল সাইয়্যিদ মাহমুহ মোস্তফা মাদানী দেওবন্দ-ফেরত তরুন চার আলেমের মহান কাজ দেখে খুব আনন্দিত হলেন। ১৯৪৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর বরিশালের চক বাজার জামে এবাদুল্লাহ মসজিদে মাহমুদ মোস্তফা মাদানী সাহেবের সভাপতিত্বে সে অঞ্চলের আলেমে দ্বীন ও বুযুর্গদের নিয়ে নতুন প্রতিষ্ঠিত মাদরাসার সার্বিক সহযেগিতার বিষয়ে একটি সাধারণ বৈঠক হয়। সবাই সহযোগিতার আশ্বাস দিলে মাদরাসার স্থায়ী জায়গার বন্দোবস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত বটতলা মসজিদেই প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক কার্যাদি চালিয়ে যাওয়া হবে বলে সে মিটিং- এ স্থির করা হয়। দারুল উলূম দেওবন্দের প্রথম ছাত্র-শিক্ষকের নাম মাহমুদ, ও আওলাদে রাসূল মাহমুদ মোস্তফা মাদানীর নামের ভিত্তির মাদরাসার নামকরণ করা হয় ‘মাহমুদিয়া’। উস্তাযগণ বিনা বেতনেই জায়গির থেকে ছাত্রদের পড়াচ্ছিলেন। মাদানী সাহেবের বড় ছেলে সাইয়্যিদ মাসউদ মাদানী ছিলেন মাদরাসার প্রথম ছাত্র।

কিছুদিনের মধ্যেই ১০ টি পুকুর সমৃদ্ধ ৫০ বিঘা জমির একটি খালি জায়গা পাওয়া যায়। দেশভাগের পর স্থানীয় হিন্দুরা এ জায়গা বিক্রি করে চলে যেতে চাচ্ছিল। প্রথমে পুকুরসহ ৩৪ শতাংশ জমি ১ হাজার টাকা দিয়ে মাদরাসার জন্য কেনা হলো। ধীরে ধীরে মাদরাসার অর্থায়নে ২৫ বিঘা জমি ও ৫ টি পুকুর ক্রয় করা হয়েছে। মাওলানা নেছারুদ্দীন সাহেব এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেন।

মাওলানা আবদুল কাদিরকে মোহতামিম, মাওলানা নেছারুদ্দীনকে নায়েবে মোহতামিম, মাওলানা আবদুল মান্ননকে ছদরুল মুদাররিসিন ও মাওলানা নূর আহমদকে নায়েবে নাযিম মনোনীত করে মাদরাসা কার্যক্রম চালানো হতে থাকে। প্রতিষ্ঠার কিছুকালের মধ্যেই মাদরাসা দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত উন্নীত হয়ে যায়। ১৯৫৮ সালে সর্বপ্রথম দাওরায়ে হাদীস বিভাগ খোলা হয়।

অল্প কয়েকজন ছাত্র নিয়ে শুরু করা মাহমুদিয়া মাদরাসাটি বর্তমানে দেশের দেওবন্দীধারার অন্যমত প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠান। বরিশাল ও পার্শ্ববর্তি অঞ্চলের জন্য এ মাদরাসা রহমতস্বরূপ। সে অঞ্চলে দ্বীনের পরিবেশ কায়েম ও ইলমের সম্প্রসারণে এ মাদরাসার অবদান অপরিসীম।

তাখাসসুস ফিল ফিকহ্, তাকমীলসহ বিভিন্ন বিভাগে বর্তমানে প্রায় ১২০০ ছাত্র এ মাদরাসায় ইলম শিখছে। জামিয়ার উস্তায ও প্রধান মুফতি মাওলানা ছানাউল্লাহ সাহেবের কাছ থেকে এসব তথ্য সরবরাহ করা হয়।