ঐতিহাসিক মুসা খান মসজিদ: ঢাকার বুকে বারো ভুঁইয়াদের শেষ স্মৃতিচিহ্ন

83

ওলিউর রহমান।।

মুসা খান মসজিদ। বারো ভুঁইয়াদের স্মৃতি বিজড়িত বাংলা অঞ্চলের মধ্যযুগীয় অতীত ইতিহাসের গৌরব বহনকারী মুসা খান মসজিদটি চরম অবহেলিত অবস্থায় কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের পশ্চিম পাশে খাজা শাহবাজ খান মসজিদ থেকে দক্ষিণে কিছুটা দূরে দু’টি উঁচু খিলানের ছাদ বিশিষ্ট ভিতের উপর সুদৃশ্য তিনটি গম্বুজের মুসা খান মসজিদ। মসজিদের উত্তর-পূর্বদিকে মুসা খানের কবর নিয়ে মুসা খান মসজিদ কমপ্লেক্স গঠিত। মসজিদের পশ্চিম দেয়ালের পাশে ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ও অধ্যাপক আনোয়ারুল আযীমের কবর রয়েছে।

বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল যেখানে অবস্থিত সেখানে মুসা খানের নির্মিত অসংখ্য দালানকোঠা ছিল বলে ঐতিহাসিক মত পাওয়া যায়। কিন্তু ১৯০৪ সালে পূর্ব বাংলা সরকারের সরকারি ভবন ও কার্জন হল স্থাপনের সময় কালের সাক্ষী হয়ে থাকা মুসা খানের তৈরিকৃত স্থাপনাগুলো ভেঙ্গে ফেলা হয়। শুধুমাত্র মুসা খান মসজিদ ও তার মাজারটি অবশিষ্ট থাকে।

মুসা খানের নামানুসারে পুরান ঢাকার চানখাঁরপুল, লালবাগ, সদরঘাট এবং সুপ্রিমকোর্ট, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও শাহবাগ নিয়ে গঠিত হয়েছিল “বাগ-ই-মুসা” বা মুসার বাগান। তখনকার সময়ে এ সমগ্র অঞ্চলটি মুসা খানের ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হত।

মুসা খান। মসনদ-ই-আলা ঈসা খানের পুত্র। বারো ভুঁইয়ার অন্যতম ঈসা খানের ছিল খিজিরপুর অঞ্চলের জমিদারি। তার রাজধানী ছিল সোনারগাঁয়। পিতা ঈসা খানের মৃত্যুর পর মুসা খান জমিদারি লাভ করেন। বৃহত্তর ঢাকা, কুমিল্লা জেলার অর্ধেক, বৃহত্তর রংপুর, বগুড়া ও পাবনা জেলার কিছু অংশ এবং ময়মনসিংহের প্রায় সমগ্র এলাকাজুড়েই তার জমিদারি বিস্তৃত ছিল।

বাংলায় বারো ভুঁইয়ার শাসনামলে অসংখ্য স্থাপত্যকর্ম নির্মিত হয়েছিল। সেযুগের স্থাপত্যকর্মের মধ্যে দুর্গ ও মসজিদ ছিল প্রধান। কালের পরিক্রমায় সেগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত। তবে ধ্বংসপ্রক্রিয়া উপেক্ষা করে ভুঁইয়াদের যে কীর্তি আজও টিকে আছে; মুসা খান মসজিদ ও তার মাজার এর অন্যতম।

এ মসজিদের স্থাপত্যশৈলী প্রসঙ্গে ইতিহাস একাডেমির জার্নালে বিশিষ্ট গবেষক মিন্টু আলী বিশ্বাস লিখেছেন, ‘মসজিদের দরজা দিয়ে জুল্লাহতে প্রবেশ করলে এক অপূর্ব স্থাপত্যশৈলী দৃষ্টিগোচর হয়। আয়তাকার নামাজগৃহের অভ্যন্তরে পূর্ব থেকে পশ্চিম দেয়াল পর্যন্ত আড়াঁআড়িভাবে দুটি খিলান তৈরি করে কিবলা কোঠাকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। মসজিদের আচ্ছাদনে তিনটি কন্দাকৃতির গম্বুজ অষ্টকোণাকার ড্রামের উপর স্থাপন করা হয়েছে। মধ্যবর্তী গম্বুজটি অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত। উপরের কোনায় চারটি ছোট অর্ধ গম্বুজাকৃতি স্কুইঞ্চ পশ্চিমমুখী দুটি প্রশস্ত খিলান এর ভার বহন করছে। গম্বুজের নিম্নাংশের ড্রামগুলোর চারদিকে সুদৃশ্য মার্লন নকশা রয়েছে। গম্বুজগুলোর শীর্ষে পদ্মপাঁপড়ীর ওপর কলস ফিনিয়াল লক্ষ্য করা যায়।’

 

মসজিদ সংলগ্ন মাদরাসার ধ্বংসাবশেষ

ঐতিহাসিক অন্যান্য মসজিদের মতো এ মসজিদকে কেন্দ্র করেও একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। জমিদার পরিবার ও শহরের সম্ভ্রান্ত ঘরের ছেলেরা এখানে পড়তে আসতো।

এ বিষয়ে মিন্টু আলী বিশ্বাস লেখেন, “এই মসজিদের ভিতটি উচ্চতায় ৩.০৫ মিটার, বাইরের দিকে উত্তর–দক্ষিণে দৈর্ঘ্য ১৭.৬৪ মিটার এবং পূর্ব–পশ্চিমে প্রস্থ ১৪.০২ মিটার। এই উঁচু ভিতের মধ্যে কয়েকসারি ভল্ট আকৃতির কক্ষ লক্ষ্য করা যায়। কক্ষগুলোতে প্রবেশের জন্য পশ্চিম দেয়ালে তিনটি প্রবেশপথ আছে। প্রত্যেকটি কক্ষের সাথে একটি করে বুকসেলফ আছে। এ থেকে অনুমান করা যায়, মসজিদটি নির্মাণের সময়ে ‘মাদরাসা মসজিদ‘ হিসাবেই নির্মিত হয়েছিল। মোগল ঢাকার অনেক মসজিদেই এ বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়।”

তবে দুঃখজনক হলো, একসময় বাংলা অঞ্চলের বিশিষ্ট ঘরের ছেলেদের পাঠশালা এখন অযত্ন, অবহেলায় পড়ে আছে। ময়লা-আবর্জনা, বাঁশ-কাট ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মেঝেতে। নানা জায়গায় খসে গেছে দেয়ালের পলেস্তারা। দেশের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উচিত বাংলার মধ্যযুগীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণে এই মসজিদটির উত্তম সংরক্ষণ করা।