কেমন হওয়া উচিত রমযান পরবর্তী জীবন?

89

মাওলানা ইমদাদুল্লাহ বিন আশরাফ আলী।।

রমযান হল ঈমান-আমলের উন্নতি ও তাকওয়া হাসিলের এক মোক্ষম সময়। এটি পুরো বছর গুনাহ বর্জন, ইবাদতের শক্তি সঞ্চয় ও আত্মিক পাথেয় সংগ্রহের এক মহা সুযোগ। ঐ ব্যক্তিই রমযান হতে কাক্সিক্ষত সুফল ও উপকার গ্রহণ করতে পারল, যে নিজের জীবনকে পরিবর্তন করতে পারল। রমযান হতে অর্জিত পাথেয় নিজের জীবনে ধারণ করতে পারল। হতে পারল মুত্তাকী- যে কিনা আল্লাহর আনুগত্য ও তাকওয়ার সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হয়েছে।

রমযান কেন্দ্রিক মানুষের প্রকারভেদ

এক. যারা রমযানের পূর্বেও আল্লাহ তাআলার অনুগত হয়ে ইবাদত-বন্দেগী করতেন। রমযান মাসের আগমনে এর ফযীলত ও গুরুত্ব উপলব্ধি করে নেক আমলের বিষয়ে আরো তৎপর হয়েছেন। তাদের প্রতি নিবেদন হল, তারা যেন রমযানের পরও রমযান থেকে অর্জিত পাথেয় নিয়ে আরো উদ্যমী হয়ে আল্লাহর আনুগত্য এবং ইবাদত-বন্দেগীতে অটল থাকেন, আরো উন্নতি সাধন করেন। রমযানে কৃত নেক আমলের ধারা জারি রাখেন।

দুই. যারা রমযানের পূর্বে ছিলেন গাফেল-উদাসীন। রমযানের আগমনে এর ফযীলত ও গুরুত্ব উপলব্ধি করে আমলের প্রতি তৎপর হয়েছেন। তাদের প্রতি আহ্বান, তারা যেন রমযানের পর ইবাদত-বন্দেগী হতে পুনরায় গাফেল না হয়ে যান; বরং রমযানের নেক আমলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন এবং আজীবন এর উপর অটল-অবিচল থাকার চেষ্টা করেন। রমযানে আল্লাহ নেক আমলের যে তাওফীক দিয়েছেন একে জীবনে ধারণ করে নিজেকে ধন্য করেন।

তিন. যাদের অবস্থা এই যে, রমযান আগমন করল ও বিদায় নিল; কিন্তু তাদের উপলব্ধি ও জীবনধারায় কোনো পরিবর্তন ঘটল না। এদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান হল, আপনি নিরাশ হবেন না; আপনার জীবন এখনো ফুরিয়ে যায়নি। আখেরাতের পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ শেষ হয়ে যায়নি। ইনশাআল্লাহ আবার আপনার জীবনে রমযান আসবে। আসুন, হতাশা ঝেড়ে ফেলে অবিলম্বে আল্লাহর নিকট তাওবা করি এবং তাঁর আনুগত্যের পথে চলতে শুরু করি। ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ আপনাকে তাঁর মাগফিরাত ও রহমতের চাদরে ঢেকে নেবেন।

যাইহোক, যারা রমযানের হক্ব আদায় করে যথাযথভাবে রোযা পালন করেছেন এবং তাকওয়া-পরহেযগারীর গুণে গুণান্বিত হয়েছেন, ইবাদত বন্দেগীতে অগ্রগামী হয়েছেন, তারা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি, তাঁর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। এর উপর আমৃত্যু অবিচল থাকার চেষ্টা ও দুআ করি।

আর যারা রমযানকে যথাযথ কাজে লাগাতে পারেননি তারা আগামীর জন্য দৃঢ় সংকল্প করি এবং আল্লাহর মাগফিরাত ও রহমতের প্রত্যাশী হই।

আমি কি রমযান থেকে পাথেয় গ্রহণ করতে পেরেছি?

রমযান মাসে গুনাহ বর্জন ও নেক আমলের যে অনুশীলন করেছি, তা থেকে কি জীবনের পাথেয় অর্জন করতে পেরেছি? আমি কি সফল রোযাদার? রোযার মাধ্যমে আল্লাহর ভয় ও তাঁর আনুগত্যের যে অঙ্গীকার আমি করেছি, তা কি ঠিক রাখতে পারছি? কিছু লক্ষণ দ্বারা আমি নিজেকে যাচাই করে নিই। দৃষ্টান্ত স্বরূপ :

ক. ঈদের দিন কি পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করেছি? বা আমার কি জামাত ছুটে গেছে?

খ. ঈদের খুশীর নামে গান-বাদ্য, নাটক-সিনেমা ইত্যাদিতে মেতে উঠেছি? ইন্টারনেটের অপব্যবহার করেছি?

গ. ঈদ উপলক্ষে বেপর্দা, ফ্রি মিক্সিং ও বিনোদনের নামে বিভিন্ন পাপের অনুষ্ঠানে জড়িয়ে পড়েছি?

ঘ. রমযান-পূর্ববর্তী অলসতা-উদাসীনতা কি আবার আমাকে গ্রাস করছে?

প্রকৃত রোযাদার কিন্তু ঈদের দিন আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আদায় করে। এই ভেবে খুশি হয় যে, সে দীর্ঘ এক মাস আল্লাহর হুকুম পালন করেছে এবং ইনশাআল্লাহ গুনাহ থেকে ক্ষমা লাভ করেছে। আর সাথে সাথে সে এই ভয়েও ভীত থাকে যে, আমার আমল কি আল্লাহর দরবারে কবুল হল? এজন্য সে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করতে থাকে, যাতে তিনি তার আমল কবুল করে নেন এবং তাকে তাঁর মুত্তাকী বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করেন।

সুতরাং রমযানের আমল কবুল হওয়ার আলামত হল, বান্দা নিজেকে ঈমান-আমলের ক্ষেত্রে তার পূর্বের অবস্থার চেয়ে উত্তম অবস্থায় পাবে এবং সৎকর্মে আরো বেশি অগ্রগামী হবে।

সুতরাং মুমিন বান্দা শুধু মৌসুমভিত্তিক ইবাদত করেই ক্ষান্ত হবে না; বরং সর্বদা ইবাদত জারি রাখার চেষ্টা করবে। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّىٰ يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ.

তুমি মৃত্যু অবধি তোমার রবের ইবাদত করতে থাক। -সূরা হিজর (১৫) ৯৯

রমযানোত্তর আমলের ধারাবাহিকতা

রমযান অতিবাহিত হয়ে গেলেও মুমিন সারা বছরই রমযানে কৃত আমলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। সারা বছর কীভাবে আমরা রমযানে কৃত আমলগুলোর ধারা চালু রাখতে পারি সে বিষয়ে নিম্নে আলোকপাত করা হল।

রোযা রাখার ধারা

রমযানের রোযা শেষ হলেও অবশিষ্ট মাসগুলোতে বহু নফল রোযা রয়েছে। সামর্থ্য অনুযায়ী সেসব রোযা রাখার চেষ্টা করব। যেমন-

শাওয়াল মাসের ছয়টি রোযা

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

مَنْ صَامَ رَمَضَانَ ثُمّ أَتْبَعَهُ سِتّا مِنْ شَوّالٍ، كَانَ كَصِيَامِ الدّهْرِ.

যে ব্যক্তি রমযান মাসের রোযা রাখল। অতপর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোযা রাখল, সে যেন সারা বছর রোযা রাখল। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৬৪

প্রতি চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তিন দিনের রোযা (আইয়ামে বীযের রোযা)

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

ثَلَاثٌ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ، وَرَمَضَانُ إِلَى رَمَضَانَ، فَهَذَا صِيَامُ الدّهْرِ كُلِّهِ .

প্রতি মাসে তিন দিন রোযা রাখা এবং রমযান মাসের রোযা সারা বছর রোযা রাখার সমতুল্য। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৬২

অন্য বর্ণনায় আছে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

صَوْمُ ثَلَاثَةِ أَيّامٍ مِنَ الشّهْرِ، صَوْمُ الشّهْرِ كُلِّهِ.

মাসে তিন দিন রোযা রাখা পুরো মাস রোযা রাখার সমান। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৫৯

প্রতি বৃহস্পতিবার ও সোমবার রোযা রাখা

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

تُعْرَضُ الأَعْمَالُ يَوْمَ الِاثْنَيْنِ وَالخَمِيسِ، فَأُحِبّ أَنْ يُعْرَضَ عَمَلِي وَأَنَا صَائِمٌ.

حَدِيثُ أَبِي هُرَيْرَةَ فِي هَذَا البَابِ حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ.

সোম ও বৃহস্পতিবার বান্দার আমলসমূহ আল্লাহর নিকট পেশ করা হয়। তাই আমি পছন্দ করি যে, আমার আমল পেশ হোক এমতাবস্থায় যে, আমি তখন রোযাদার। -জামে তিরমিযী, হাদীস ৭৪৭

আরাফার দিনের রোযা

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ، أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السّنَةَ الّتِي قَبْلَهُ، وَالسَّنَةَ الّتِي بَعْدَهُ.

আরাফার দিনের রোযার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা করি যে, (এর দ্বারা) বিগত বছরের এবং পরবর্তী বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৬২

আশুরার রোযা

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, নবীঁজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

صِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ، أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السّنَةَ الّتِي قَبْلَهُ.

আশুরার রোযা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে, এর দ্বারা তিনি বিগত বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৬২

 

শাবান মাসে বেশি বেশি রোযা রাখা

শাবান মাসে অধিক পরিমাণে রোযা রাখা উত্তম। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা. বলেন-

لَمْ يَكُنْ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ فِي الشّهْرِ مِنَ السّنَةِ أَكْثَرَ صِيَامًا مِنْهُ فِي شَعْبَانَ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাবান মাস ব্যতীত বছরের অন্য কোনো মাসে এত অধিক (নফল) রোযা রাখতেন না। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭৮২

নফল নামাযের ধারা

রমযানের দীর্ঘ তারাবীহর নামায শেষ হয়েছে। এই তারাবীহ দ্বারা লম্বা সময় দাঁড়িয়ে থেকে একসাথে অনেক রাকাত নামায আদায় করার একটা ভালো অভ্যাস সৃষ্টি হয়েছে। এই অভ্যাস পুরো বছরই রক্ষা করা উচিত। নিম্নে এ আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষার কয়েকটি ক্ষেত্র উল্লেখ করা হল।

ক. কিয়ামুল লাইল

কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদ নামায রমযান ও রমযানের বাইরে সারা বছরের নফল নামায। তাহাজ্জুদের গুরুত্ব ও ফযীলত প্রসঙ্গে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

أَفْضَلُ الصّلَاةِ، بَعْدَ الْفَرِيضَةِ، صَلَاةُ اللّيْلِ.

ফরয নামাযের পর সর্বোত্তম (নফল) নামায হল, রাতের নামায তথা তাহাজ্জুদ। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৬৩

খ. সুন্নাতে রাতেবা

দৈনিক ফরয নামায সংশ্লিষ্ট ১২ রাকাত সুন্নতে মুআক্কাদাহ নামায আদায় করা। যথা, যোহরের পূর্বে চার রাকাত, পরে দুই রাকাত, মাগরিবের পর দুই রাকাত, এশার পর দুই রাকাত এবং ফজরের পূর্বে দুই রাকাত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

مَنْ صَلّى اثْنَتَيْ عَشْرَةَ رَكْعَةً فِي يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ، بُنِيَ لَهُ بِهِنّ بَيْتٌ فِي الْجَنّةِ.

যে ব্যক্তি দিবারাত্রিতে ১২ রাকাত (সুন্নত) নামায আদায় করবে, বিনিময়ে তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করা হবে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭২৮

গ. ইশরাক/চাশত

প্রতিদিন সকালে দুই/চার রাকাত ইশরাকের নামায পড়া। সূর্যোদয়ের প্রায় ১০/১৫ মিনিট পর থেকে এই নামায পড়া যায়। এর ফযীলত সম্পর্কে হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত আছে। রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

ابْنَ آدَمَ ارْكَعْ لِي أَرْبَعَ رَكَعَاتٍ مِنْ أَوّلِ النّهَارِ أَكْفِكَ آخِرَهُ.

قال الترمذي: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ.

হে আদম সন্তান! তুমি দিনের শুরুতে আমার জন্য চার রাকাত নামায আদায় কর, আমি পুরো দিন তোমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাব। -জামে তিরমিযী, হাদীস ৪৭৫

ঘ. তাহিয়্যাতুল অযু

দুই রাকাত করে তাহিয়্যাতুল অযু ও দুখূলুল মাসজিদ নামায নিয়মিত অনায়াসেই আদায় করা যায়। অযু করার পর মাকরূহ ওয়াক্ত না হলে বিলম্ব না করে দুই রাকাত নামায পড়া ম্স্তুাহাব। এই নামাযকে ‘তাহিয়্যাতুল অযু’ বলা হয়। হাদীস শরীফে এই নামাযের অনেক ফযীলতের কথা বর্ণিত হয়েছে। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ يَتَوَضّأُ فَيُحْسِنُ الْوُضُوءَ، ثُمّ يَقُومُ فَيَرْكَعُ رَكْعَتَيْنِ، يُقْبِلُ عَلَيْهِمَا بِقَلْبِهِ وَوَجْهِهِ، إِلّا قَدْ أَوْجَبَ.

তোমাদের মধ্য হতে যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অযু করবে। অতপর দেহ-মন (আল্লাহর দিকে) ধাবিত করে দুই রাকাত নফল নামায পড়বে, সে (যেন) নিজের জন্য জান্নাত ওয়াজিব করে নিল। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৬৯

ঙ. তাহিয়্যাতুল মাসজিদ

মসজিদে প্রবেশ করে সময় থাকলে বসার পূর্বে এবং মাকরূহ ওয়াক্ত না হলে অন্তত দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মাসজিদ নামায আদায় করা মুস্তাহাব। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

إِذَا دَخَلَ أَحَدُكُمُ المَسْجِدَ فَلْيَرْكَعْ رَكْعَتَيْنِ قَبْلَ أَنْ يَجْلِسَ.

তোমাদের কেউ যখন মসজিদে প্রবেশ করবে, সে যেন বসার পূর্বে দুই রাকাত নামায আদায় করে নেয়। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৪৪

 

যিকিরের ধারা

হাদীস শরীফে বর্ণিত বিভিন্ন সময় ও মুহূর্তে পঠিতব্য মাছূর দুআ ও যিকির, নামাযের পরে ও সকাল-সন্ধ্যার ফযীলতপূর্ণ তাসবীহ ও যিকিরসমূহ নিয়মিত পাঠ করা।

 

দুআর ধারা

দুআ মুমিনের জীবনের অনেক বড় হাতিয়ার। এর মাধ্যমে সে আল্লাহর নিকট থেকে সবকিছুই আদায় করে নিতে পারে। আর দুআ কবুল হওয়ার  বিষয়টি শুধু রমযানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

মুমিনের বৈধ কোনো দুআই আল্লাহ ফিরিয়ে দেন না। বিলম্বে হলেও বা ভিন্নরূপে কিংবা পরকালের সঞ্চয়রূপে তা কবুল করে থাকেন। এছাড়া রমযানের বাইরেও দুআ কবুল হওয়ার বিশেষ কিছু সময় রয়েছে। যেমন, শেষ রাতে, ফরয নামাযের পর, আযান ও ইকামতের মাঝে, জুমার দিন, কুরআন মাজীদ খতমের পর ইত্যাদি। সুতরাং সাধারণ ও বিশেষ সময়গুলোতে বেশি বেশি দুআর মাধ্যমে দোজাহানের যাবতীয় কল্যাণ হাসিল করে নেয়া উচিত হবে।

 

দান-সদকার ধারা

রমযানে যাকাত, সাদাকাতুল ফিতর এবং অন্যান্য দান-সদকার আমল শেষ হলেও সারা বছর এ আমলের দ্বার উন্মুক্ত। যাকাত ও সাধারণ দান-সদকা রমযানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গোটা বছরই এর সময় এবং তা সবসময়ই ফযীলতপূর্ণ আমল। অতএব সামর্থ্য অনুযায়ী সারা বছরই দান-সদকার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা উচিত। কেননা দান-সদকার দ্বারা সম্পদ হ্রাস পায় না; বরং বৃদ্ধি হয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

يَمْحَقُ اللهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ.

আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান-সদকাকে বৃদ্ধি করেন। -সূরা বাক্বারা (২) : ২৭৬

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ.

দান-সদকা সম্পদ হ্রাস করে না। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৮৮

কুরআন তিলাওয়াতের ধারা

কুরআনে কারীমের তিলাওয়াত অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ ও মর্যাদাসম্বলিত একটি আমল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ، وَالحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا، لَا أَقُولُ الم حَرْفٌ، وَلَكِنْ أَلِفٌ حَرْفٌ وَلَامٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ.

قال الترمذي : هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ غَرِيبٌ مِنْ هَذَا الوَجْهِ.

যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পাঠ করল, তার বিনিময়ে সে একটি নেকী লাভ করল। উক্ত একটি নেকি দশটি নেকীর সমতুল্য গণ্য করা হবে। আমি বলছি না যে, ‘আলিফ-লাম-মিম’ একটি হরফ। বরং ‘আলিফ’ একটি হরফ, ‘লাম’ একটি হরফ এবং ‘মীম’ একটি হরফ। -জামে তিরমিযী, হাদীস ২৯১০

অর্থাৎ অন্যান্য আমলের ক্ষেত্রে যেমন পুরো আমলকে একটি বলে গণ্য করা হয়, কুরআনের ক্ষেত্রে সেরূপ নয়; বরং এখানে প্রতিটি হরফের পরিবর্তে একটি করে নেকী হবে। আর প্রতিটি নেকীর বিনিময়ে দশটি করে নেকী পাওয়া যাবে।

অতএব হে সম্মানিত পাঠক! আসুন, এভাবে সারা বছরের জন্য নেক আমলের ধারা চালু রাখি, অলসতা বর্জন করি। গুনাহমুক্ত জীবন-যাপনের অভ্যাস গড়ে তুলি। আল্লাহ তাআলা সবাইকে ঈমানের উপর দৃঢ় রাখুন, নেক আমলের তাওফীক দান করুন, আমীন।