ইলমের আবশ্যকীয় দুটি সিফাত, আল্লাহর ভয় ও ইলম অনুযায়ী আমল

239

শিহাব সাকিব।।

আল্লাহর ভয়, ইলমী সফরের গন্তব্য

আল্লাহ তালা বলেন, إنما يخشى الله من عباده العلماء
অর্থ : আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে আলেমরাই তাকে যথাযথ ভয় করে।
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, যে সত্যিকার ইলমের আলামত হল খাশয়াতুল্লাহ, আল্লাহভীতি।

মুফতি শফী রহ. সব সময় তালিবুল ইলমদের বলতেন, হাকিকী ইলমের আলামত যখন খোদাভীতি তখন আমাদের ছাত্র শিক্ষক সবাইকে নিজের হিসাব নেয়া চাই। এই আলামত কি আমার মাঝে তৈরি হয়েছে, নাকি এখনো হয়নি? বারবার এই ফিকর করা উচিৎ।

তিনি বলতেন, নির্দিষ্ট গন্তব্যের লক্ষে যখন কোন মুসাফির রেলগাড়ীতে ওঠে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে কোন কোন স্টেশন সে অতিক্রম করছে। তার পরিচিত স্টেশনগুলো অতিক্রম করছে কি না ফরক করতে চেষ্টা করে। এর মাধ্যমে তার গন্তব্যের পথ যাচাই করে। যদি স্টেশনগুলোকে আপন মনে হয়, তাহলে বোঝে আমি ঠিক পথেই চলছি। এবং এই স্টেশনগুলোর দ্বারা অনুমান করে তার গন্তব্যের পথ কতদূর এখনো বাকি।
স্টেশনগুলোকে যদি অচেনা লাগে, মনে হয় এই প্রথম দেখছি, তাহলে ধরে নেয় গাড়ী ভিন্ন লাইনে চলছে। এপথে চললে তার ঠিকানায় পৌঁছাতে পারব না। দ্রুত অন্য গাড়ীতে ওঠার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে।

ঠিক তেমনি ইলমের মুসাফিরদেরও উচিৎ হৃদয়জানালা দিয়ে উকিঁ দিয়ে দেখা যে গন্তব্যের পথে চলছি তো? খোদাভীতির স্টেশনের দিকে যাচ্ছি তো? যদি এই স্টেশনের চিহ্নগুলো উপলব্ধিতে আসে তাহলে বোঝবে তোমার সফর ঠিক পথেই চলছে।

কিন্তু খোদাভীতি বিনয় ইনাবত ইলাল্লাহ ইত্তেবায়ে সুন্নাহর পরিবর্তে উদাসীনতা আত্মম্ভরিতা ক্ষমতা ও ধনসম্পদের মোহ এবং মনচাহি যিন্দেগির স্টেশনের নিদর্শন দেখা যায় তাহলে বোঝে নিবে সে ভুল গাড়ীত চড়েছে। এই গাড়ী তাকে ইলমের ঐ স্টেশনে পৌঁছাবে না, যে ইলম অর্জন করতে আল্লাহ ও তার রাসুল স. নির্দেশ দিয়েছেন।–মেরে ওয়ালিদ মেরে শায়খ, পৃষ্ঠা ১৩৭,১৩৮।

 আমলবিহীন ইলম বেকার

নবী করীম স. বলেন,
لا تزول قدما عبد يوم القيامة حتى يسأل عن أربع، عن عمره فيما افناه، وعن علمه ماذا عمل فيه… رواه الترمذي في سننه (2417)

কিয়ামতের দিন বান্দা চারটি প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগ পর্যন্ত আপন স্থান থেকে নড়তে পারবে না।
এক. কী কাজে তোমার জীবন কাটিয়েছ?
দুই. যে ইলম তুমি হাসিল করেছিলে সে অনুযায়ী আমল করেছিলে?..

আবুদ দারদা রা. বলেন, আল্লাহ আমাকে কেয়ামতের মাঠে যেসব প্রশ্ন করবেন তার মাঝে কেবল এই প্রশ্নকে ভয় করি যে, আল্লাহ বলবেন, তুমি তো ইলম হাসিল করেছিলে, সে অনুযায়ী আমল করেছিলে? -ইকতিযাউল ইলমিল আমাল, লিল খতিব আল বাগদাদী, পৃষ্ঠা ৪১।

মুফতি শফী র. বলতেন, ব্যবসায়ীরা বছরে একদিন তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে পুরা বছরের হিসাব মিলায়। দেখে কত আয় হল আর কত ব্যয়।তেমনি আমাদেরও উচিৎ হিসাব মিলানো, এক বছরে কী কী পড়লাম, তার মধ্য থেকে কতটুকুর উপর আমল করলাম। আর এই ইলম আমার যিন্দেগীতে কী পরিবর্তন আনলো।–ইলম পর আমল করেঁ, মুফতি তকী উসমানী ,পৃষ্ঠা ১৩।

হযরত মাওলানা মুফতি তকী উসমানী হাফি. বলেন, কারো মাঝে আল্লাহভীতি এবং ইলম অনুযায়ী আমল না থাকলে তার যত জ্ঞানই থাকুক, সে যত বড় গবেষকই হোক তার সব গবেষণা মূল্যহীন ও তুচ্ছ।

মুফতি শফী র. বলতেন, শুধু ইলমই যদি কারো আলেম ও বড় হওয়ার জন্য যথেষ্ট হতো তাহলে শয়তানও অনেক বড় আলেম হত। যে সব প্রচ্যবিদ রাত দিন ইলমী গবেষণায় ব্যস্ত থাকে তারা অনেক মুসলিম আলেম থেকেও বেশি তথ্যের জ্ঞান রাখে। কিন্তু কী মূল্য এই জ্ঞানের, যে জ্ঞান তাকে ঈমানের পথ দেখায় না? ঠিক তেমনি যে ব্যক্তি ইলম অনুযায়ী তার জীবন সাজায় না,‍ আমলী যিন্দেগীতে ইলমের কোন প্রভাব পড়ে না, তার ইলম বেকার ও মূল্যহীন।–মেরে ওয়ালিদ মেরে শায়খ, মুফতি তকী উসমানী, পৃষ্ঠা ১৩৪,১৩৫।

নবী করীম স. আল্লাহর কাছে দুয়া করতেন, وزدنا علما اللهم انفعنا بما علمتنا وعبمنا ما ينفعنا
হে আল্লাহ, তুমি আমাদেরকে যে ইলম দান করেছ তা থেকে উপকৃত হওয়ার তাওফিক দাও। আর আমাদের উপকারে আসে এমন ইলম দান কর। এবং আমাদের জ্ঞান বাড়িয়ে দাও। ইনশাআল্লাহ, আমরাও যতবার আল্লাহর দরবারে হাত ওঠাব, এই দোয়া করব। আল্লাহই তাওফিক দাতা।