ইবনে খালদুন, পশ্চিমাদের ৫শ বছর আগেই সমাজবিজ্ঞানের বহু তত্ত্বের আবিস্কারক 

131

ইসলাম টাইমস ডেস্ক: ইবনে খালদুন। পুরো নাম আবু জায়েদ আবদুর রহমান বিন মুহাম্মদ বিন খালদুন আল হাদরামি। তিনি ছিলেন একজন আরব মুসলিম পণ্ডিত। আধুনিক সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস ও অর্থনীতির জনকদের মধ্যে তাকে অন্যতম বিবেচনা করা হয়। ১৩৩২ সালের ২৭ মে তিউনিসে খালদুনের জন্ম। মৃত্যু ১৪০৬ সালের ১৯ মার্চ কায়রোতে।

হাফসিদ রাজবংশের অধীনে তার পূর্বপুরুষরা নিয়োজিত ছিলেন। খালদুনের পরিবারের অতি উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ থাকার বদৌলতে শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতদের কাছে তার পড়াশোনার সুযোগ হয়েছিল। ক্লাসিক্যাল ইসলামি শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি কোরআন মুখস্থ করেছিলেন তিনি। রাজনীতিতেও জড়িয়েছিলেন।  তিনি বেশ কবার জেলও খাটেন। সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে আসীন হন, আবার নির্বাসনে যান।

ইতিহাসবেত্তা ও দার্শনিক ইবনে খালদুন : তিউনিসে জন্ম নেওয়া খালদুনের বেড়ে ওঠা সেখানেই, কিন্তু জীবনের পূর্ণতাপ্রাপ্তি হয় কখনো ফেজে, কখনো আন্দালুসিয়া তথা স্পেনে কখনো কায়রোয়। পুরো উত্তর আফ্রিকা চষে বেড়িয়েছেন তিনি।

তার প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন শুরু হয় তার বাবার কাছ থেকে। তারপর স্থানীয় তিউনিসীয় আলেমদের কাছে বিদ্যার্জন করেন। আন্দালুসিয়া থেকে হিজরত করে অনেক গুণী পন্ডিত, বিশেষজ্ঞ এসে তিউনিসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। বালক ইবনে খালদুন এদের সংশ্রব লাভ করেন। আঠারো বয়স পর্যন্ত তার শিক্ষার্জনের কাল চলে। এ সময়েই মিসর থেকে মৌরিতানিয়া পর্যন্ত সমগ্র উত্তর আফ্রিকায় ভয়াবহ প্লেগ রোগ দেখা দেয়।

ইবনে খালদুন নিজেই এর বর্ণনা করেছেন এভাবে- ‘কার্পেটের মধ্যে যা ছিল সবসুদ্ধই কার্পেটকে জড়িয়ে নিয়েছে এই মহামারি…ইন্তেকাল করেছিলেন আমার আব্বা এবং আমার মা-ও।’ তখন তিনি হিজরত করে মৌরিতানিয়া যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে বড় ভাই নিষেধ করায় আর যাননি। এরপর ডাক পেয়েছেন সুলতানের মোহররক্ষী হিসেবে কাজ করার জন্য, যখন তার বয়স বিশ বছরের নিচে। ইবনে খালদুনের পরের জীবন ছিল অনেকটাই অস্থিতিশীল।

ইবনে খালদুন ছিলেন মূলত একজন ঐতিহাসিক। তার ইতিহাস গ্রন্থের মুকাদ্দামা তথা ভূমিকা তাকে কালজয়ী এক ঐতিহাসিকের আসনে সমাসীন করেছে। তিন মুকাদ্দামা রচনা করেছিলেন ১৩৭৭ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যভাগে মাত্র পাঁচ মাসের পরিশ্রমে। এ মুকাদ্দামায় ইবনে খালদুন সমাজবিজ্ঞান জ্ঞানের এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিলেন।

ইবনে খালদুনের মতে, ইতিহাস শুধু ঘটনার সমষ্টি নয় বরং এটি গবেষণার উপযোগী একটি বিজ্ঞান। তিনি ইতিহাসের মাঝে দর্শনকে খুঁজে বের করেছেন। ইতিহাস বিশ্লেষণ প্রয়োগ করেছেন সমাজতত্ত্বে। এই বৈশিষ্ট্যের গুণে তিনি স্বতন্ত্র হয়েছেন পূর্ববর্তী ইতিহাস রচনাকারীদের থেকে।

ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে ইবনে খালদুন উদ্ভাবন করেছেন নতুন একটি পদ্ধতির। এই পদ্ধতির মৌল তত্ত্বগুলো পরবর্তী সময়ে সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি তার মুকাদ্দিমায় দাবি করেছেন-‘এতে নতুন ভিত্তির খোঁজ পাওয়া যাবে এবং এর বিষয় বস্তু আগ্রহোদ্দীপক।….কোনো সমাজকে বিশ্লেষণ করতে হলে তার অবস্থা, বৈশিষ্ট্য, সময়ে সময়ে যেসব ঘটনা বা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং যেসব অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার প্রশ্নই উঠে না- এই তিনিটি অবস্থাকে পৃথক করতে হবে।’

আবার তিনি তার সমাজতত্ত্বের পাঠ পরিক্রমার শুরুতে রেখেছেন নৃতত্ত্বের আলোচনা যা আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের অতি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ইবনে খালদুন সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সমাজ সম্পর্কে অধ্যয়ন ও গবেষণায় নিজেকে ব্যাপৃত করেছিলেন।

নিজের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের আলোকে তিনি মানব সমাজ ও তার বৈশিষ্ট্যসমূহকে একটি নতুন জ্ঞানে রূপদান করেছিলেন। তিনি সমাজকে যাযাবর জীবনযাত্রা থেকে নগর ও রাষ্ট্রের পত্তনের মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের অবস্থা পর্যন্ত সকল পর্যায়ে ব্যবচ্ছেদ করে বিচার করার চেষ্টা করেছিলেন। এ গবেষণায় তিনি মানব সমাজের দৃঢ়তা ও দুর্বলতা, নতুন ও পুরাতন যুগ, উত্থান ও পতনের দিকে সমান নজর দিয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি সমাজের সুপরিসর ভিত্তির ওপর ইতিহাসকে দাঁড় করিয়ে গেছেন, যা তার পূর্ববর্তীরা করেননি।

ইবনে খালদুন সমাজ ও সভ্যতার উদ্ভব, বিকাশ ও প্রকৃতি সম্পর্কে  একটি সাধারণ তত্ত্বের ধারণা দেন। অনুমান নির্ভর ধারণাকে বাদ দিয়ে পর্যবেক্ষণ ভিত্তিক প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে তিনি গুরুত্ব দেন। তার মতে, ঘটনা প্রবাহের বিশ্লেষণই উপযুক্ত পদ্ধতি।

তিনি সাম্রাজ্যের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়কে পাঁচ ভাগে ভাগ করেন- ভূ-খণ্ড বিজয়, সাম্রাজ্য গঠন, সর্বোচ্চ স্তরে আরোহণ, শক্তি হ্রাস এবং পতন। ইবনে খালদুনের ধারণায় একটি রাষ্ট্র এই পাঁচটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। তার মতে মানুষ যেমন শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বার্ধক্য, জরা ও মৃত্যুর মধ্যদিয়ে জীবন শেষ করে তেমনি রাষ্ট্রের জীবনেও শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বার্ধক্য, জরা ও মৃত্যু প্রক্রিয়ার মধ্যে অতিবাহিত হয়।

ইবনে খালদুন এমন এক যুগে জন্মেছিলেন যে যুগে ইসলামের শক্তি ও আধিপত্যে ভাঙ্গন শুরু হয়েছিল। ইসলামি চিন্তা ধারা হয়ে পড়েছিল অনাহুত, অবহেলিত। এজন্যে ইবনে খালদুনের রচনাবলী সাধারণের দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায়। পাশ্চাত্যে ইবনে খালদুন পরিচিত হন ১৬৯৭ সালে। এর প্রায় শতাব্দী পরে ১৮০৬ সালে ফরাসী প্রাচ্য বিশেষজ্ঞ স্যাল ভেল্টার দ্য সাকি মুকাদ্দামার কয়েকটি পরিচ্ছেদ অনুবাদ সহ তার জীবনী ছাপেন। এরপর একজন অস্ট্রীয় প্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ভন হ্যামার পার্গস্টল (Von Hammer Purgstall: Thar Hunderten der Hidschort) ইসলামি শক্তির পতন সম্পর্কে ১৮১২ সালে একটি পুস্তক প্রকাশ করেন। এ পুস্তকে লেখক ইবনে খালদুনের রাষ্ট্রের পতন সম্পর্কীয় মতবাদ উল্লেখ করে তাকে ‘আরবীয় মন্টেস্কু (ফরাসি দার্শনিক)’ বলে অভিহিত করেছেন।

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে ইউরোপের গবেষকদের কাছে ইবনে খালদুন পরিচিত হয়ে উঠতে শুরু করেন। এবার পাশ্চাত্য জানতে পারল ইসলামের ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতার এই মহান গুণী সম্পর্কে। কারণ তিনি ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে এমন সব অর্থনৈতিক, দার্শনিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন যা পাশ্চাত্য জানতে পেরেছিল আরও কয়েক শতাব্দী পরে। তারা দেখতে পান ইবনে খালদুনের তত্ত্বগুলোই আলোচিত হয়েছে তার এক শতাব্দী পরে ম্যাকিয়ভেলির(১৪৬৯-১৫২৭) রচনায় এবং আরো তিন চার শতক পরের ভিকো (১৬৬৮-১৭৪৪), মন্টেস্কু (১৬৬৯-১৭৫৫), এ্যডাম স্মিথ (১৭২৩-১৭৯০), অগাস্ট ক্যোঁৎ (১৭৯৮-১৮৫৭) প্রমুখের রচনায়।

প্রথমে মনে করা হত পাশ্চাত্যের গবেষকরাই এ সব তত্ত্বগুলোর আবিষ্কর্তা। কিন্তু পরে গবেষণায় পাওয়া গেল গামবাতিস্তা ভিকোর পূর্বেই আরবীয় পন্ডিত ইবনে খালদুন ইতিহাসের দর্শন ও গতিপ্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। ভিকো নব বিজ্ঞান বা The new science বলে যে দাবি করেছেন তা আসলে উত্তর আফ্রিকার সেই রাজকর্মচারী ইবনে খালদুনের মাথায় ঢুকেছিল অনেক আগেই। অগাস্ট ক্যোঁৎ The new science নামে একটি শব্দ পাশ্চাত্যের অভিধানে সংযোজন করেন। কিন্তু তার পাঁচ শতাব্দী আগে প্রাচ্যের অভিধানে তা শোভা বর্ধন করেছিল। `আল উমরান` নামে একটি পরিভাষা। ইবনে খালদুন তার মতবাদসমূহ শুধু উপস্থাপন করেই ক্ষান্ত হননি, যুক্তিতর্কের মাধ্যমে সেসবকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।

জার্মানির স্টুটগার্ট শহর থেকে ১৯০১ সালে T.J de Boer একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন যার নাম `Gesehicher Der philosophie in Islam` বইটিতে ইবনে খালদুন সম্পর্কে তার মতামত প্রকাশ করে দ্য বোয়ের উপসংহারে বলেছেন, গবেষণার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে পরবর্তীকালে অন্য কেউ গবেষণা শুরু করুক, ইবনে খালদুনের সে ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছে, তবে মুসলমানদের দ্বারা তা সম্ভব হয়নি। কোন পূর্ববর্তী মনিষীকে অনুসরণ না করেই যে প্রতিভাটির আবির্ভাব ঘটেছিল, সে প্রতিভাকে অনুসরণ করতে মুসলিম সমাজে কেউ এগিয়ে আসে নি।

অধ্যাপক লুডউইগ গুমপ্লায়িজ বলেন, ‘ইবনে খালদুন কোন পরিবারের উত্থান-পতন সম্পর্কে `তিন বংশ স্তরের` যে ধারণা দেন তা এখন অটোকার লরেঞ্জের কৃতিত্বের ভান্ডারে। অথচ লরেঞ্জের অনেক আগেই আরব দার্শনিক এই তত্ত্ব প্রচার করেছিলেন। বিস্ময়কর ব্যাপার ইবনে খালদুন সমর বিজ্ঞানের যেসব রীতি পদ্ধতি আলোচনা করেছিলেন ইউরোপীয়দের উত্থানের পুরো যুগে তাদের সেনাপতিরা সেসব রণকৌশল প্রয়োগ করেছেন। এছাড়া ম্যাকিয়াভেলি শাসকদের যেসব উপদেশ দিয়েছিলেন শতবর্ষ আগে ইবনে খালদুনও তা-ই লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিলেন। অথচ তা কেউ জানত না।’

উপসংহারে বলেন- ‘শুধু অগাস্ট কোঁতেরই বহু বছর আগে নয় বরং ইতালীয়গণ যে ভিকোকে জোরজবরদস্তি করে প্রথম সমাজতত্ত্ববিদদের আসনে বসাবার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছেন, তারও বহু বছর আগে একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান সাফল্যের সাথে সমাজতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং এ বিষয়ে নিজের মতবাদ প্রকাশ করে গেছেন। তিনি যা লিখে গেছেন আজ সেটাই আমরা সমাজতত্ত্ব বলে মনে করি।’

ছয় শতাব্দী আগে আরব চিন্তাবিদ ও দার্শনিক ইবনে খালদুন বলেছিলেন, ইতিহাস চক্রাকারে ঘোরে। একটি বংশধারার প্রতিনিধিত্ব তিন প্রজন্ম স্থায়ী হয়। এরপর তাদের সমৃদ্ধশালী যুগের অবসান ঘটে। একটি বংশধারার অনুসারীদের মধ্যে অভিন্ন উদ্দেশ্যের চেতনা যত দিন উজ্জীবিত থাকে এবং যত দিন তারা ন্যায়বিচারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত থাকেন এবং তাদের মধ্যে সংহতি থাকে তত দিন তাদের অবস্থা ভালো থাকে। কিন্তু অপর একটি গ্রুপের সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হওয়ার পর নতুন বংশধারার উন্মেষ ঘটার আলামত শুরু হতে দেখা যায়। আসলে বিস্ময়কর প্রতিভাধর ইবনে খালদুনকে আমরা তেমন করে এখনো জানিনা। বিশ্বখ্যাত মুসলিম এই মনীষীকে এখনো অনেক জানার বাকী আমাদের।