পাহাড়ে আযানের আওয়াজ নিয়ে কেন এই গা-জ্বলুনি!

300

ওলিউর রহমান।।

বাংলাদেশের প্রয়াত লেখক হুমায়ুন আহমেদের ছেলে নুহাশ হুমায়ূন পাহাড়ের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কাছে ইফতার ও সাহরির সময় জানিয়ে দেওয়া এবং পাহাড়ে আযান ও নামায নিয়ে একটি টিভি-বিজ্ঞাপন নির্মাণ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন এটি ছড়িয়ে আছে।

টেকনো ফোনের প্রচারে করা নুহাশের এই ভিডিওটি নিয়ে বাংলাদেশের কথিত প্রগতিশীলদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে  দেখা যাচ্ছে। তারা পাহাড়ি জীবনে নামায, রোযা, ইফতারের এই বিজ্ঞপনটিকে মেনে নিতে পারছেন না। তাদের অব্যাহত চাপের মুখে ফেসবুকে পোস্ট করে ক্ষমা চাইতে হয়েছে নুহাশকে।

টিভিতে প্রচারিত কোনো বিজ্ঞাপনে ইসলামের কোনো বিধান বা শিয়ারকে শুধুমাত্র কোনো কোম্পানীর প্রচার বা বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যবহার করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত অথবা ধর্মীয় দৃষ্টিতে টিভি-বিজ্ঞাপনের ভালোমন্দ কী কী বিষয় আছে সেটা স্বতন্ত্র আলোচনার বিষয়। ইসলাম বিশেষজ্ঞরা তাদের নিয়মিত আলোচনায় এসব নিয়ে আলোচনা করে থাকেন।

তবে পাহাড়ে আযানের আওয়াজ পৌঁছে দেওয়া ও  সাহরি ইফতারের সময় বলে দিয়ে করা নুহাশের বিজ্ঞাপনটি নিয়ে বাংলাদেশের স্যকুলার সমাজের ‘পাহাড়ে সম্প্রীতি বিনাশ’ ও ‘বাঙালিদের পাহাড়ে আগ্রাসন’সহ আরো নানান শব্দবন্ধ ও ট্যাগ আরোপ করে যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো তা নিঃসন্দেহে হতাশার ও আতঙ্কের।

বলা হচ্ছে, বিজ্ঞাপনটিতে পাহাড়ে বসবাসরত ‘বাঙালি’ এবং ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে সম্প্রীতির চিত্র ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে সেখানকার পাহাড়ি ও বাঙালিদের ঐতিহাসিক পটভূমির সত্যতাকে খর্ব করা হয়েছে।

অথচ চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, বান্দারবনসহ সারাদেশের ছোটবড় প্রায় সব পাহাড়েই নির্বিবাদ ও নির্বিরোধে প্রকাশ্যে চলছে খ্রিস্টান মিশনারীর তৎপরতা; সে নিয়ে এসব কথিত সুশীল স্যাকুলারদের কোনো মাথাব্যাথা দেখা যায় না।

পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি পাহাড়ের অধিবাসীদের মধ্যে কেবল আযান কিংবা আযানের সংবাদ পৌঁছে দেয়ার একটি বিজ্ঞাপন নিয়ে ‘পাহাড়ে সম্প্রীতি বিনষ্টের’ কথা বলে স্যাকুলারদের একটি গোষ্ঠীর যে উগ্র ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে তাতে তাদের ইসলামি সংস্কৃতি বিরোধী এজেন্ডা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি হওয়াটাই সঙ্গত।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষিত বিবেচনায় কাউকে কাউকে বিজ্ঞাপনটির বাস্তবতা নিয়েও আপত্তি করতে দেখা যাচ্ছে। এতে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে যে টিভিতে প্রচারিত যাবতীয় বিজ্ঞাপনই কি বাস্তবসম্মত!

আর বিজ্ঞাপনের এই একটি ঘটনা দিয়ে অব্যাহতভাবে পাহাড়ে পাহাড়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর উপর চলা নির্যাতনকে ধর্মের পোষাক পরানোর একটা প্রচেষ্টা-তৎপরতা দেশি, বিদেশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ব্যাপারে দেখা যাচ্ছে।

অনলাইনভিত্তিক একটি সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন করেছে ‘বিজ্ঞাপন নিয়ে পাহাড়িদের সমালোচনার মুখে নুহাশ’ – আর প্রমাণ হিসেবে কেবল এক-দুইজনের সামাজিক মাধ্যমে জানানো আপত্তি হাজির করা হয়েছে।

অথচ বিজ্ঞাপনের কনসেপ্ট ও স্ক্রীপ্ট তৈরিকারী তুরাস আইমান সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন,  ধর্মীয় সম্প্রীতির চিত্র তুলে ধরার উদ্দেশ্যেই বিজ্ঞাপনটি তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশের পাহাড়ে পাহাড়ে গিয়ে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে যে হৃদ্যতার সম্পর্ক আমাদের চোখে পড়েছে সেটি তুলে ধরাই ছিল আমাদের বিজ্ঞাপনটির মূল উদ্দেশ্য। কোনো গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়েরর ঐতিহাসিক কোনো বাস্তবতাকে খাটো করার কোনো উদ্দেশ্য কারো ছিল না।

বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে স্বাভাবিক জীবন নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার এ দেশের প্রত্যেক নাগরিকের মতো পাহাড়ে বসবাসরত একজন উপজাতিরও আছে। তাদের সাথে কোনোপ্রকার অন্যায় করা হলে সেটা নিয়ে সমাজের প্রত্যেক শ্রেণির মানুষই কথা বলতে পারেন।

তবে ইসলাম ও মুসলমান প্রশ্নে নিজেদের উদ্বেগ প্রকাশ করতে গিয়ে পৌত্তলিকতাবাদী স্যাকুলাররা যে বারবার ইসলাম-বিদ্বেষী বক্তব্য দেন দেশের সম্প্রীতির জন্যই তা পরিহার করা উচিত। বিজ্ঞাপনের আযান নিয়ে কথা বলার আগে বাংলাদেশের পাহাড়ে পাহাড়ে স্বাধীন জুমল্যান্ড বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলা উচিত। একই সঙ্গে প্যারিস,  বার্সেলোনা ও ইটালির রোম থেকে আসা ধর্মযাজকদের সহায়তা- প্রলোভন,  নগদ ঋণ, চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবা দিয়ে বাংলাদেশের পাহাড়িদের ফাঁদে ফেলে তাদের মধ্যে খ্রিস্টবাদের প্রচার বন্ধের উদ্যোগও নেওয়া উচিত।

পরিতাপের বিষয় হল, পাহাড়ে খ্রিস্টবাদের প্রচারে ও দেশব্যাপি নানান বিদেশি সংস্কৃতির আমদানিতে আমাদের স্যাকুলার সমাজ শঙ্কিত না হলেও দুইমিনিটের একটি ছোট্ট বিজ্ঞাপনে আযান-নামাযের উপস্থিতি দেখেই তারা পাহাড়ি সংস্কৃতি বিপন্ন হয়ে যাওয়ার আতঙ্কে আকঙ্কিত হয়ে ওঠেন ।