মুনশি মেহেরুল্লাহ: মিশনারি আধিপত্যের বিরুদ্ধে ঈমানের জাগ্রত নকীব

218

ওলিউর রহমান।।

উপমহাদেশে ইংরেজ উপনিবেশবাদের সময় রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে খ্রিস্টবাদের যে ব্যপক প্রচার শুরু হয়েছিল তার বিরুদ্ধে অপ্রাতিষ্ঠানিক যে ক’জন সংগ্রাম করে গেছেন মুনশি মেহেরুল্লাহ তাদের অন্যতম। তাঁর গোছালো যুক্তিভিত্তিক পরিপাটি বক্তৃতা ও ক্ষুরধার লেখনি খ্রিস্টান হয়ে যাওয়া বা খ্রিস্টানদের অপপ্রচারে দ্বিধাগ্রস্ত অনেককে ফিরিয়ে এনেছে সরল সঠিক পথে।

খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত জন জমিরুদ্দীন ১৮৯২ সালের জুন মাসে ‘খ্রিস্টীয় বান্ধব’ নামের এক মাসিক পত্রিকায় ‘আসল কুরআন কোথায়’ শিরোনামে একটি বিভ্রান্তিমূলক প্রবন্ধ ছাপে। ধোঁয়াশার মতো সে কিছু অবান্তর প্রশ্ন ছুড়ে দেয় কুরআনের ব্যাপারে এবং মুসলমানদের চ্যালেঞ্জ গ্রহন করতে বলে।পাঠকদের অনেকেই হকচকিয়ে যায় তখন। দ্বীনদার মানুষ ভাবছিলেন এ প্রবন্ধের একটি শক্তিশালী লিখিত জবাব প্রয়োজন।

জুন মাসেরই ২৭ তারিখে সেকালের বিখ্যাত ‘সাপ্তাহিক সুধাকরে’ ‘খ্রিস্টানী ধোঁকা ভজন’ শিরোনামে গবেষণামূলক একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ ছাপা হলো। জন জমিরুদ্দীনের খুঁড়া প্রশ্নগুলোর যুক্তিসঙ্গত উত্তর প্রদান করা হয় এ গবেষণা-প্রবন্ধে। সাধারন মানুষ হাফ ছেড়ে বাঁচে। দ্বীনদার মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেল। সাপ্তাহিক সুধাকরেই আবার ছাপা হয় আরো তথ্যসমৃদ্ধ আরো ক্ষুরধার যুক্তি দিয়ে সাজানো প্রবন্ধ ‘এবার কুরআন সর্বত্র’।

জন জমিরুদ্দীন হতভম্ব হয়ে যায়। চ্যালেঞ্জের কথা ভুলে এই প্রবন্ধকারের সাক্ষাত প্রত্যাশা করে। খ্রিস্টধর্মে ছেড়ে দিয়ে পুনরায় ইসলামে প্রবেশ করে। জনগণ খুঁজতে থাকে কে এই লেখক।

তিনি মুনশি মেহেরুল্লাহ। বৃহত্তর যশোরের অন্তর্গত বর্তমান ঝিনাইদহে ১৮৬১ সালের ২৬ ডিসেম্বরে সম্ভ্রান্ত তবে অসচ্ছল পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা ওয়ারিস উদ্দীন মারা যান মেহেরুল্লাহ পাঁচ বছর বয়সেই। মায়ের উৎসাহ ও নিজের চেষ্টায় বিভিন্নজন থেকে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। চৌদ্দবছর বয়সে কিছুদিনের জন্য বাড়ি ছেড়ে কায়খালী গ্রামে যান পড়ালেখা করতে। এ সময়ে মৌলভী মেছবাহুদ্দীন ও মৌলভী ইসমাঈলের কাছে আরবি, উর্দু, ফারসি ভাষা শিখেন। এ ছাড়াও নিজ প্রচেষ্টায় আরো অনেক বিষয়েই তিনি জ্ঞানার্জন করেন।

কায়খালীতে থাকাকালে তিনি দেখতে পান এনজিও তৎপরতায় নানা কৌশলে কিভাবে দরিদ্র মুসলমান ও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়। তাই ত্রিত্ববাদের অসারতা নিয়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রচুর পড়াশোনা করেন।

কর্মজীবনে মুনশি মেহেরুল্লাহ ছিলেন যশোরের একজন প্রসিদ্ধ দর্জি। যশোরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর কাছ থেকে কাপড় সেলাতেন। ম্যাজিস্ট্রেটেরর মধ্যস্থতায় একবার দার্জিলিং সফর করেন মুনশি মেহেরুল্লাহ। দার্জিলিং-এ থাকাকালে বৃটিশ সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে খ্রিস্টান পাদ্রীদের ইসলাম ও মুসলমানদের নিয়ে প্রকাশ্য সভা-সমাবেশে নানা কটুক্তি তাঁকে ব্যথিত করে। সেখানে থেকেই বাইবেল, ত্রিপিটক, বেদসহ অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ তিনি অধ্যয়ন শুরু করেন। বিতর্কে নামার যাবতীয় জ্ঞান তিনি রপ্ত করেন।

ত্রিত্ববাদের অসারতা ও খ্রিস্টানদের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে তিনি বক্তৃতা প্রদান শুরু করলেন বিহার, বাংরা ওড়িশার মাহফিলে মাহফিলে। ইসলামের শাশ্বত পয়গাম ও শান্তির বাণী তিনি মানুষের কাছে পেশ করতে লাগলেন চমৎকার উপস্থাপনায়। তার দাওয়াতে অনেক অমুসলিম ইসলামে দীক্ষিত হলো। নিখিল বঙ্গে তার উপাধি দেয়া হলো ‘বাগ্মী কুল তীলক’।

লেখার হাতও ছিল তাঁর বেশ পাকা। চমৎকার বর্ণনায় ক্ষুরধার যুক্তি দিয়ে শিক্ষিত সমাজের কাছে পেশ করেছেন নিজের কথামালা। তাঁর লেখনীর সম্মোহনী শক্তিতে জন জমিরুদ্দীনের মতো ঘোর ইসলাম বিদ্বেষী পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করে।

তাঁর প্রকাশিত অপ্রকাশিত গ্রন্থের তালিকা অনেক দীর্ঘ।

‘খ্রিস্ট ধর্মের অসারতা’ নামে তাঁর প্রথম বই প্রকাশিত হয় ১৮৮৬ সালে। বইটিতে খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের কার্যকলাপের বিস্তর তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রদান করা হয়। এতে বাইবেলের দুর্বলতার যুক্তিপূর্ণ সমালোচনাও করা হয়। দ্বিতীয় বই ‘মেহেরুল এসলাম’। অত্যন্ত  সরল-সহজ ভাষায় সাধারণ পাঠকের উপযোগী করে বইটি পুঁথি আকারে লিখিত। এতে সুন্দরভাবে একত্ববাদের মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে। খ্রিস্টান পাদ্রীদের মিথ্যা প্রচারণার বিরুদ্ধে তিনি লিখেন ‘রদ্দে খ্রিস্টান’ নামের একটি তেজস্বী বই। মুনশি রচিত গ্রন্থাবলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল বিধবা গঞ্জনা ও হিন্দু ধর্ম রহস্য। দ্বিতীয় বইটিতে মুনশি মেহেরুল্লাহ হিন্দু বিধবাদের জীবনের বাস্তব করুণ চিত্র মর্মস্পর্শী ভাষায় তুলে ধরেছেন। মুনশি মেহেরুল্লার মৃত্যুর পর কতিপয় হিন্দু সমাজপতির দ্বারা প্ররোচিত হয়ে ব্রিটিশ সরকার বই দুটি বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে প্রকাশকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী সাহিত্যিক, অসাধারণ বাগ্মী, ইসলাম প্রচারক ও সমাজসংস্কারক মুনশি মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ ১৯০৭ সালের ৭ জুন শুক্রবার জুমার নামাজের সময় মাত্র ৪৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুর খবর বাংলা ও আসামের পত্রপত্রিকায় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হয়।

মুনশি মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ সম্পর্কে আকরম খাঁ বলেছেন, ‘আমার জীবনে ও সাহিত্যে দেশপ্রেমের যে স্ফূরণ, তার মূল প্রেরণা এসেছে কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্লাহর কাছ থেকে।

নিখিল বঙ্গ কংগ্রেসের সভাপতির ভাষণে আকরম খাঁ আরও বলেন, ‘কর্মজীবনের প্রারম্ভে স্ব-সমাজের দৈন্য-দুর্দশায় যে তীব্র অনুভূতি আমার মন ও মস্তিষ্ককে বিচলিত করিয়া তুলিয়াছিল, আপনাদেরই একজন ক্ষণজন্মা মুসলমান কর্মবীরের (মুনশি মেহেরুল্লাহ) সাধনা আদর্শ তাহার মূলে অনেকটা প্রেরণা জোগাইয়া দিয়াছিল।’

তার অন্তরঙ্গ বন্ধু শেখ জমিরুদ্দিনের ভাষায়, ‘যিনি বঙ্গীয় মুসলমান সমাজে সভা-সমিতি অধিবেশনের সূত্রপাত করিয়াছেন, যিনি খৃস্টধর্মসংক্রান্ত পুস্তকাদি লিখিয়া পাদ্রী ও খৃস্টানদিগের বিষদন্ত ভগ্ন করিয়াছেন, সেই মুসলিম মূলরত্ন বাগ্মী মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ।’

‘কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্লাহ একাডেমী’ নামে বর্তমানে যে প্রতিষ্ঠানটি রয়েছে, এটি ১৯০১ সালে মুনশী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘মাদ্রাসায়ে কারামাতিয়া’র পরিবর্তিত নাম।

মুনশী মেহেরুল্লার স্মরণে বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৫ সালের ৭ জুন তার ৮৭তম মৃত্যুবার্ষিকীতে ছবিসহ স্মারক ডাকটিকিট ও স্মারক খাম প্রকাশ করে।