বসনিয়া গণহত্যা : ইউরোপে মুসলিম নিধনের এক বর্বরতম ট্র্যাজেডি

237

ওলিউর রহমান ।।

বসনিয়া গণহত্যা। নব্বইয়ের দশকে সংঘটিত হওয়া এক নির্মম ট্র্যাজেডি। মানবতা ভুলন্ঠিত করা এ গণহত্যার শিকার বেশিরভাগই ছিলেন মুসলিম। মুসলমানদের নির্মূল করার উদ্দেশ্যে জাতিগত শুদ্ধি অভিযান চালিয়েছিল সার্বরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কখনও এত বড় গণহত্যা ও জাতিগত শুদ্ধি অভিযান পৃথিবী দেখেনি।

 

৫১ হাজার ১৯৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ৩.৫ মিলিয়ন জনসংখ্যা বিশিষ্ট বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ইউরোপের বলকান উপদ্বীপের একটি মুসলিম রাষ্ট্র। দেশটির উত্তর-পশ্চিমে ক্রোয়েশিয়া, পূর্বে সার্বিয়া, দক্ষিণ-পূর্বে মেসিডোনিয়া, দক্ষিণে অ্যাড্রিয়াটিক সাগর। এর রাজধানী সারায়েভো।

১৯৭১ সাল নাগাদ বসনিয়ায় মুসলমানরা একক বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করত। পরবর্তী দুই দশকে, অসংখ্য সার্ব আর ক্রোয়াট বসনিয়ায় অভিবাসিত হন। এর ফলে ১৯৯১- এর এক আদমশুমারিতে দেখা যায়, বসনিয়ার ৪০ লাখ বাসিন্দার ৪৪ শতাংশ বসনিয়ান, ৩১ শতাংশ সার্ব, আর ১৭ শতাংশ ক্রোয়াট।

উসমানীয় শসনামলে বসনিয়া।

ঐতিহাসিকভাবে বসনিয়ায় ইসলামী আদর্শের শক্ত অবস্থান রয়েছে। সেখানে ইসলামি ঐতিহ্য চর্চার ক্ষেত্রে ‘গাজি হুসরেভ বে মাদরাসা’ ও ‘সারায়েভো ইসলামিক ডিসিপ্লিন’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বসনিয়ায় রয়েছেন বহু মুসলিম বুদ্ধিজীবী; যারা গোটা ইউরোপে ইসলামের আদর্শকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টায় রত।

পনের শতকে সুলতান মুহাম্মদ ফাতেহ এই বসনিয়াকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। উনিশ শতকের শেষদিকে রাশিয়ার সাথে উসমানীয় সাম্রাজ্যের যুদ্ধের ফলে দেশটি উসমানীয় সাম্রাজ্য হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে অস্ট্রিয়হাঙ্গেরি রাজ্যের অধীনে চলে যায় এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ শতকের নব্বয়ের দশকে স্বাধীনতা লাভের আগ পর্যন্ত  যুগোস্লাভিয়ার অংশ হিসেবে থাকে।

স্বাধীন বসনিয়ার মুসলিম।

গত শতকের ষাট ও সত্তরের দশকের দিকে বসনিয়ার মুসলমানরা মার্শাল টিটোর জোটনিরপেক্ষ নীতির সুবাদে যুগোস্লাভিয়া থেকে বেরিয়ে যেতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু করে। এ সময় তাদের মধ্যে ইসলামী মূল্যবোধের পুনর্জাগরণও ঘটে।

১৯৯০ সালে যুগোস্লাভিয়ার পতনের পর বসনিয়ানদের স্বাধীনতা দাবির প্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক অন্যায় শর্ত জুড়ে দেওয়া গণভোট কার্যক্রমের পর ১৯৯২ সালের ১ মার্চ যুগোস্লাভিয়ার কাছ থেকে স্বাধীনতা পায় বসনিয়া। মে মাস নাগাদ জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় কমিউনিটি বাহ্যত বসনিয়ার স্বাধীনতার স্বীকৃতিও দেয়।

কিন্তু সার্বরা বসনিয়ার মুসলমানদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী বা ইসলামী মনোভাবের বিস্তার- কোনোটাকেই সহ্য করতে পারছিল না। ফলে মুসলমানদের নির্মূল করার উদ্দেশ্যে বসনিয়ায় জাতিগত শুদ্ধি অভিযান শুরু করে তারা।

সেব্রেনিকায় নিহতদের স্তুপাকার লাশ।

১৯৯২ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া মুসলিম নিধন থামে ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরে। ততদিনে সার্ব সৈন্যরা নৃশংসভাবে লক্ষাধিক মুসলিম যুবক, বৃদ্ধ ও বালককে হত্যা করে। বহুসংখ্যক মুসলিম নারীর ইজ্জত হরণ করে। এমনকি বাদ দেয়নি অতিশয় বৃদ্ধা বা ছোট মেয়েদেরও।

যুগোস্লাভিয়ার উপর অস্ত্র-নিষেধাজ্ঞার কারণে বসনিয়ানরা আত্মরক্ষার অস্ত্রও পাচ্ছিলো না। নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়ার আবেদন করলেও জাতিসংঘ তা গ্রাহ্য করেনি। বরং সার্বদের ঘটনায় হস্তক্ষেপ করাকে অনধিকারচর্চা বলে অভিহিত করে।

যারা মরে গেছে তারা বেঁচে গেছে।

নানা নাটকের পর মুসলমানদের ভয়াবহ জাতিগত নিধনের এক পর্যায়ে জাতিসংঘ বসনিয়ায় শান্তিরক্ষী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। একটি বৃহৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের মাত্র ছয়টি স্থানকে বসনিয়ানদের জন্য সেফ জোন হিসেবে নির্ধারণ করে দেয়।

কিন্তু যেখানে ৩৭ হাজারের বেশি সৈন্য প্রয়োজন ছিল সেখানে মাত্র ৭ হাজারের মতো সৈন্য মোতায়েন করা হয়। এর মধ্যে কার্যকরভাবে মোতায়েন ছিল মাত্র ৩ হাজারের কিছু বেশি সৈন্য।

সেব্রেনিকা শহরকে সেফ জোন হিসেবে ঘোষণা করলেও সেখানে ৬ হাজার সৈন্যের প্রয়োজনীয়তার বিপরীতে মোতায়েন করা হয়েছিল মাত্র কয়েকশ ডাচ শান্তিরক্ষী। সেটাও আবার খুবই সাধারণ অস্ত্র সজ্জিত অবস্থায়।

সব কিছু সাজানোই ছিল। ফলে কোনও রকম বাঁধা ছাড়াই ডাচ সৈন্যদের একপ্রকার সহায়তায় ১১ জুলাই শহরটি দখলে নিয়ে ব্যাপক গণহত্যা শুরু করে সার্বরা।

লাইনে দাঁড়িয়ে হত্যা করে নিরাপত্তার ঘোষণা দেওয়া ৮ হাজার মুসলিম যুবক ও নাবালেগ ছেলেদের। সেই গণহত্যার প্রমাণ ভিডিওচিত্র ধ্বংস করে সেখানে জাতিসংঘের নিযুক্ত ডাচ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা। এভাবেই গণহত্যার প্রমাণ লোপাট করা হয়।

২০০৭ সালে “আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত” সার্বিয়ার বিরুদ্ধে বসনিয়ার আনা এক ঐতিহাসিক সিভিল ল-সুইটের রায় ঘোষনা করে। যদিও আদালত রায়ে সেব্রেনিকা হত্যাযজ্ঞকে গণহত্যা অভিহিত করে, এবং বলে যে সার্বিয়া এই গণহত্যা ঠেকাতে এবং এর জন্য দায়ীদেরকে বিচারের মুখোমুখি করতে পারতো; তবে খোদ সার্বিয়াকেই এই গণহত্যার জন্য অপরাধী ঘোষণা করা থেকে তারা বিরত থাকে।

বসনিয়ার এই ঘটনা মুসলমানের জন্য পশ্চিমা দুনিয়া আর জাতিসংঘর আচরনকে বুঝার জন্য যথেষ্ট সহায়ক। আল্লাহ বসনিয়ায় শহীদদের মর্যাদা বৃদ্ধি করুন। যারা বেঁচে আছে তাদের ইজ্জতের জীবন দান করুন।

 

ছবি ও তথ্য সহায়তা : আল-জাজিরাহ, বিবিসি, নিউ ইয়র্ক টাইমস, টাইম ম্যাগাজিন, ইতিহাসের পুনর্পাঠ, রোর বাংলা