নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্রে মুসলিম বিজ্ঞানীদের বিপ্লবী সংযোজন

152

এনাম হাসান জুনাইদ।।

একুশ শতকে এসে আজ পশ্চিমা বিশ্বকে মনে করা হয় আবিষ্কারের জগত। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব যদি একটু নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করে তাহলে এটা কখনো অস্বীকার করতে পারবে না যে, অতীতে যখন পশ্চিমা বিশ্ব মূর্খতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, তখন একমাত্র মুসলিম বিজ্ঞানীরাই একের পর এক নিত্যনতুন আবিষ্কার করে চলেছিলেন। প্রতিদিনের ব্যবহার্য জিনিসপত্রে এমন এমন গুরত্বপূর্ণ সংযোজন ঘটিয়েছিলেন যেগুলোর মাধ্যমে পৃথিবীতে বিপ্লব এসেছিল। এ সকল বিপ্লবের কারণে যদি মুসলিম বিজ্ঞানীদেরকে বর্তমান বিজ্ঞান যুগের প্রবর্তক বলা হয় তাহলে অত্যুক্তি হবে না। চলুন আজ আমরা এমনই কিছু বিজ্ঞানী ও আবিষ্কার নিয়ে আলোচনা করি যাদের সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষই জানে না।

ওয়াটার প্রুফ ও ফায়ার প্রুফ কাগজ

জাবির বিন হাইয়্যান ছিলেন একাধারে রসায়নবিদ ও আলকেমিবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, দার্শনিক, পদার্থবিজ্ঞানী এবং ঔষধ বিশারদ ও চিকিৎসক। তাকে “রসায়নের জনক” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। জাবির ইবন হাইয়ান রসায়নে পরীক্ষণমূলক পদ্ধতির গোড়াপত্তন করেছিলেন।

তিনি রসায়নের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেছিলেন যার অনেকগুলো এখনও ব্যবহৃত হয়। যেমন: হাইড্রোক্লোরিক ও নাইট্রিক এসিড সংশ্লেষণ, পাতন এবং কেলাসীকরণ।

পাতন, উর্ধ্বপাতন, পরিস্রাবণ, দ্রবণ, কেলাসন, ভস্মীকরণ, গলন, বাষ্পীভবন ইত্যাদি রাসায়নিক সংশ্লেষণ বা অনুশীলন গবেষণার সময় পদার্থের কী কী রূপান্তর ঘটে এবং তার ফল কী দাঁড়ায়, তিনি তাও বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি চামড়া ও কাপড়ে রঙ করার প্রণালী, ইস্পাত প্রস্তুত করার পদ্ধতি, লোহা, ওয়াটার প্রুফ কাপড়ে বার্নিশ করার উপায়, সোনার পানি দিয়ে পুস্তকে নাম লেখার জন্য লোহার ব্যবহার ইত্যাদি আবিষ্কার করেন।

ফাউন্টেন পেন
একুশ শতকের যুগকে বলা হয় কম্পিউটারের যুগ। আগে যে কাজ কলমের মাধ্যমে করা হত। এখন সে কাজ কম্পিউটারের মাধ্যমে আরো সহজভাবে করা হয়। কিন্তু এরপরও কলমের আবেদন ও প্রয়োজনীয়তা কিন্তু ফুরিয়ে যায়নি। এই কলমের আবিষ্কারক হলেন একজন মিসরীয় বিজ্ঞানী। তিনি চেয়ে ছিলেন এমন কোনো কলম আবিষ্কার করতে, যার মাধ্যমে হাত কাপড়চোপড় ইত্যাদি কালির দাগ থেকে বাঁচানো যায়। তার আবিষ্কৃত কলমেও ভেতরে কালি থাকত এবং নিবের মাধ্যমে লেখা যেত।

কাঁচের তৈজসপত্র
কাঁচের তৈরি জিনিসপত্র ছাড়া আজকাল মেহমানদারি অপূর্ণ থেকে যায়। এই উপঢৌকন মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান। মুসলিম বিজ্ঞানী আলী ইবনে নাফিই সর্বপ্রথম বিশ্ববাসীকে এই কাঁচের জিনিসপত্রের সাথে পরিচিত করান ।

পেরাশুট
৮৫২ঈ. সর্বপ্রথম মুসলিম ইঞ্জিনিয়ার আব্বাস বিন ফ্রানয পেরাশুট আবিষ্কার করেন। এই বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম ঢিলেঢালা পোষাক ও কাঠের পাখার মাধ্যমে পেরাশুটের ধারণা পেশ করেন। যদিও তার উদ্দেশ্য ছিল এই পোষাক আর পাখার মাধ্যমে পাখির মত উড়ে বেড়ানো কিন্তু এইগুলোর মাধ্যমে তিনি উড়তে না পারলেও এ জিনিসগুলো তাকে নিচে পড়ে যাওয়ার গতিটাকে কমিয়ে দিয়েছে। এভাবেই দুনিয়ার প্রথম পেরাশুট আবিষ্কৃত হয়।

রকেট এবং টর্পেডো
১৫ শতকে মুসলমানরা পৃথিবীকে রকেট ও টর্পেডো উপহার দিয়ে সমরাস্ত্রের জগতে এক বিপ্লব এনেছে। এটা এমন সময় ছিল যখন অমুসলিমরা এই প্রযুক্তি সম্পর্কে ছিল একবারেই অজ্ঞ।

ডিগ্রী এবং ডিগ্রী গাউন
বর্তমানে সারা পৃথিবীতেই ইউনিভার্সিটি ও কলেজ ছাত্রদেরকে শিক্ষা সমাপ্তির পর সনদ দিয়ে থাকে। ডিগ্রী দান কারী প্রথম ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা ফাতেমা ফারাবীকে মনে করা হয়। ৮৫৯ ঈ. তে মরক্কোতে বিশ্বের প্রথম ইউনিভার্সিটি কায়রোয়ান ডিগ্রি প্রদান করে।

এই ডিগ্রীকে ইজাযা বা সনদ (সার্টিফিকেট) বলা হত। এছাড়া অভিষেকের দিন শিক্ষার্থীরা যে বিশেষ টুপি ও জামা পরে থাকে তার ধারণাও আরব মুসলমানরা দিয়েছে।

 দক্ষিণ ইটালির সিলিরনো শহরে মুসলমানরাই ইউরোপের প্রথম ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করে। তারপর স্পেনের তলীতীলা, সিউল, গ্রানাডায় আরো ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সকল প্রতিষ্ঠানে ইউরোপ থেকে আগত যে সকল শিক্ষার্থী গ্রাজুয়েট করে বের হত, তারা আরবদের দেওয়া সেই বিশেষ পোষাক পরিধান করত। এই পোষাকই বলে দিত- ইনি অমুক ইউনিভার্সিটির গ্রাজুয়েট।

সূত্র: জং