ট্রেন সফর : চলতে ফিরতে দেখা নিয়ম-অনিয়ম

109

ওলিউর রহমান ।।

আগামী রবিবার বাড়িতে যাওয়ার কথা। ট্রেনের টিকেট সংগ্রহ করতে হবে। দূরের সফরের জন্য ট্রেনযাত্রা আরামদায়ক। ধুলোমুক্ত, ঝাঁকুনিমুক্ত। দুর্ঘটনার সম্ভাবনা কম। জ্যাম এড়িয়ে চলা যায়। ভাড়াও তুলনামূলক বেশি না।

ঢাকা থেকে বাড়িতে বা দূরে অন্য কোথাও বেড়াতে আমি সাধারনত ট্রেনেই চড়ি। ঢাকা থেকে আন্তনগর চলে বাংলাদেশের এমন প্রায় সব রুটেই ট্রেনে করে আমার সফর হয়েছে। তাই ট্রেন নিয়ে আমার সুখ-দুখের নানান কাহিনী আছে। সুখে তো সবসময়ই থাকি। দুঃখের কিছু কথাই বলি।

আন্তনগর, কমিউটার, মেইলসহ আরো কয়েক ধরণের ট্রেন চলে বাংলাদেশে।

সেদিন সংবাদপত্রের এক প্রতিবেদনে দেখলাম বেসরকারি কমিউটার ট্রেন প্রতিবছর অডিটে বার্ষিক লাভ দেখালেও সরকারি ট্রেনে নাকি প্রচুর লোকসান। সরকারি ট্রেনে লোকসান আসলে হওয়ারই কথা। লোকজন যেভাবে টিটির হাতে কিছু গুঁজে দিয়ে বিনা টিকেটে যাতায়াত করে লোকসানেরর পরিমাণ যে আরো বাড়ে নাই তাই তো শোকর।

দোষটাই বা শুধু টিটির কেন হবে! ভদ্রস্থ চেহারার লোকগুলো যেভাবে “আর নাই, আর নাই” বলে পকেট ঝাড়তে থাকে যে কোনো মানব-হৃদয়েরই দয়া হওয়ার কথা। পুরো টাকা না দিলে যেহেতু টিকেট দেয়া যায় না তাই টিটি মহোদয় আর সরকারি একটি রিসিপ্ট অযথা নষ্ট করতে চান না! সাথে থাকা কনস্টেবল ও কম্পার্টমেন্টের দু’দরজায় পোশাক পরা দু’জনকে চা-পানের খরচ দিয়ে সবাই মিলে তা হালাল করে দেন।

সরকারি ট্রেনগুলোর যেখানে প্রতিবছরে কয়েকশো কোটি টাকা লোকসান হয়; কমিউটার সেখানে কিভাবে লাভ দেখায় – অথচ সেবার মান লোকালের মতোই- আমার এই প্রশ্নটা ছিল অনেকদিন ধরে। অতি সম্প্রতি এই মহাজটিল প্রশ্নের সমাধান পাওয়া গেল।

একদিনের কথা। আমার এলাকা থেকে কমিউটারে করে ঢাকা আসব বলে বেরিয়েছি বাসা থেকে। কাউন্টার থেকে বলল সিট নেই। স্ট্যান্ডিং টিকেট নিতে হবে। টিকেট ছাড়াই চলে আসছি দেখে ডাক দিলো কাউন্টারের ওপাশ থেকে ” একটা সিটই আছে, চল্লিশ টাকা বেশি দিয়ে লাগলে নিতে পারেন”। টিকেটটা আমার জরুরি ছিল। তাই সেদিনের মতো চল্লিশ টাকা বেশি দিয়েই নিয়ে নিলাম। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলাম- একটা সিটই আছে বলে বলে বিশ থেকে বাইশ জন থেকে চল্লিশ টাকা করে বেশি নিল কাউন্টার থেকে। তখন চিন্তা করলাম এভাবেই কি কমিউটার ট্রেন বছরে বছরে লাভ দেখায়!

আমি অবশ্য পরে একদিন আমার হিস্যাটুকু আদায় করে নিয়েছি। আরেকদিন টিকেট নিতে গেলে যখন চল্লিশ টাকা অতিরিক্ত দাবি করল, আমি বললাম দিন। টিকেট নিয়ে শুধু চল্লিশ টাকা যখন কাউন্টারের রডের ভিতর দিয়ে ঢুকিয়ে দিলাম দুর্নীতিবাজ লোকটি হা করে দেখছিল। আমি বললাম, “আগে একদিন চল্লিশ টাকা বেশি দিয়েছিলাম আজকে শোধ নিয়েছি”। আমি চলে আসলে ভদ্রলোক গালাগাল দিচ্ছিলো কি না! তিনি নাকি আমাকে চিনে রেখেছেন। আমাকে আর টিকেট দিবেন না। আমিও বলে দিয়ে আসলাম, টাকা দিমু আমি, লাভ-লোকসান আমারটাও আমি বুঝমু!

সরকারি ট্রেনে স্নিগ্ধা, বাথ, কেবিনের সুযোগ-সুবিধে সত্ত্বেও লোকসান কেন, কারণ ও প্রকরণ নিয়ে আমার ট্রেনসফরের স্বল্পদীর্ঘ জীবনের অনেক অভিজ্ঞতা আছে। দুয়েকটার কথা এখানে বলা যায়।

সিলেট স্টেশন

একবার সিলেট সফর শেষে ঢাকা ফেরার সময় আমরা পাঁচজন ছিলাম। টিকেট করতে কাউন্টারে গেলে জানিয়ে দিল, সিট পাওয়া যাবে না। আমরা বাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলাম। কাউন্টার থেকে একজনের দিকে ইশারা করা হলো – এই লোকের কাছে যান, বসার ব্যবস্থা করে দিবে। কাউন্টার থেকে সিট দেওয়ার মতো টিকেটই নেই, আবার কোথাকার কে ট্রেনে আমাদের পাঁচজনকেই বসার ব্যবস্থা করে দিবে ! ঘটনা কী জানার কৌতূহল নিয়ে গেলাম স্টেশনের অঘোষিত নেতার কাছে। একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলে জানতে পারলাম, আমাদের বসার জন্য যে সিটগুলো দেওয়া হবে সেগুলোর টিকেট ইস্যু করা হবে না। সরকার মহোদয়ের কাছে রিপোর্ট যাবে এত তারিখ এই সিটগুলো খালি ছিল, আর আমরা যে সিটের ধার্যকৃত টাকার চেয়েও টিকেটপ্রতি বিশ টাকা করে বেশি দিয়ে আসলাম সেই টাকাসহ অন্য যারাই আমাদের মতো এমন পরিস্থিতিতে পড়েছে প্রত্যেকের টাকা যাবে ওই স্টেশন-চক্রের কাছে।

সরকারি ট্রেনের লোকসান প্রসঙ্গে আরেকটি দুঃখজনক ঘটনা মনে পড়লো।

ট্রেনে সাধারণত আমি চেয়ারকোচ বা স্নিগ্ধাতে চলি। বাথে গিয়েছি বার দুয়েক। কেবিনে যাওয়া হয়নি কখনো। কিছুদিন আগে কাতার প্রবাসী আমার এক বড় ভাই ভাবীসহ ট্রেনের কেবিনে করে ঢাকা যেতে চাইলেন। টিকেট সংগ্রহ করতে গিয়ে জানলাম, “কেবিনগুলো ডিসি, ওসিসহ স্থানীয় আমলাদের জন্য বরাদ্দ থাকে। তারা যদি না যান আর ধার্যকৃত মূল্যের দ্বিগুণ টাকা দেওয়া হয় তাহলে কেবিন পাওয়া যাবে। না হলে কেবিন খালি যাবে”। এলাকায় কিছুটা পরিচিতি ছিল তাই মুখের উপর বলে ফেললাম ” তাহলে সরকারের ঘাটতি দূর করার জিম্মাদারি আপনারা নিয়ে নিয়েছেন”।

সরকারি ট্রেনের লোকসানের খবর তো দেশের মানুষ কমবেশি সবাই জানে। দেশের প্রতি দরদও সবারই আছে। তবুও দেখতে শোনতে ভদ্রলোকগুলো টিকেট ছাড়া কেন ট্রেনে চলে ; এটা জানার কৌতূহল ছিল অনেকদিন যাবত।

চট্টগ্রাম থেকে একবার ময়মনসিংহ যাওয়ার সময় এ ব্যাপারটা বিস্তারিতভাবে জানা হলো।

প্রাচীন চট্টগ্রাম (বটতলী) স্টেশন

চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ রোডের একমাত্র আন্তনগর “বিজয় এক্সপ্রেস” চট্টগ্রাম থেকে ছাড়ে সাড়ে সাতটার দিকে। আমি চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছি ছয়টার দিকে। লাইনে দাঁড়ালাম টিকেটের জন্য। একঘন্টার মতো দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেও দেখলাম কাউন্টারের ওপাশে নিরাপত্তা জোন থেকে মহোদয়রা টিকেট দিচ্ছেন চার-পাঁচ মিনিটে একটা একটা করে। মাত্র ২১ জনের পেছনে থেকেও একঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে আমার সিরিয়াল আসলো না দেখে ট্রেন মিস করার ভয়ে প্লাটফর্মে চলে গেলাম টিকেট ছাড়াই। পরে টিটির হাতে সবার মতোই কিছু ধরিয়ে দিয়েছিলাম। ( আমি অবশ্য পুরো টাকা দিয়ে টিকেটই নিয়েছিলাম।) এখানে আমার অপারগতার ব্যাপারটা আপনারা বুঝতেই পারছেন।

আরেকবার খুলনা গিয়েছিলাম এক বন্ধুর বাসায় ট্রেনে। ট্রেনেই ফিরতে চাইলে বন্ধুর বাবা বললেন, ” টিকেট পাবা না। বরং বাসেই যাও। আমি টিকেটের বার্গেইনিংয়ের কারণে ট্রেনে সফরই ছেড়ে দিয়েছি”।

টিকেটের লাইন

 

আমি যেহেতু কমলাপুর বা দেশের আরো কিছু স্টেশনের মানবজটের ঝঞ্চাট সম্মন্ধে এবং মফস্বল শহর বা আঞ্চলিক শহরের অন্যায় -অসাধুতার প্রকরন সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা রাখি তাই ট্রেনেই আসতে সেবার হিম্মত করেছিলাম।

আরো কথা আছে। এগুলো আসলে খুচরো আলাপ। কমবেশী যারা ট্রেনে যাতায়াত করেন তারা জানেন। সরকার তো ট্রেন বাড়াচ্ছেই। সেদিনও ঢাকা থেকে রাজশাহীর দিকে বিরতিহীন একটা ট্রেন চালু হওয়ার কথা জানলাম। তবে এর দুয়েকদিন আগেই দেখলাম টিআইবি বা দুদকের রেলওয়ের দুর্নীতি নিয়ে লম্বা রিপোর্ট।

টিআইবির রিপোর্টে উল্লিখিত দুর্নীতিসহ আরো যত অনুল্লেখ্য দুর্নীতি আছে সরকারেরর সেগুলো বন্ধ করার ব্যাপারেও উদ্যোগ নেওয়া উচিৎ। নতুবা তলাহীন পাত্রে কাড়ি কাড়ি টাকার বাণ্ডিল রাখার পরও ঘাটতির অঙ্ক বড়ই হতে থাকবে কেবল, কিছুই জমা হবে না রাষ্ট্রের কোষাগারে।