নানা সময় নানা কথা: শ্রীলঙ্কা হামলায় অপরাধী আসলে কে?

398

শরীফ মুহাম্মদ ।।

২১ এপ্রিল রোববার শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে সিরিজ বোমা হামলায় এ পর্যন্ত (মঙ্গলবার রাত ১০টা) নিহতের সংখ্যা ৩১০ পার হয়েছে। আহত হয়েছেন ৫০০ মানুষেরও বেশি। সকাল থেকে শুরু হয়ে বিকেল পর্যন্ত ৮টি বিস্ফোরণের খবর এসেছে। একই দিনে সন্ত্রাসী হামলার এ জাতীয় ঘটনায় এত সংখ্যক মানুষের হতাহত হওয়ার খবরে দেশটিতে শোকের পাশাপাশি হতবুদ্ধিকর একটি পরিস্থিতি নেমে এসেছে। শুধু আক্রান্ত দেশ শ্রীলঙ্কাই নয়, রক্তক্ষয়ী এ ঘটনার উত্তাপ ও আতংক এসে ভর করেছে আশপাশের দেশেও।

কিন্তু এসবের পাশাপাশি আরেকটি বড় ব্যাপার হচ্ছে, বেদনাদায়ক এই বোমা হামলায় ‘দোষী’ ও হামলার সঙ্গে ‘জড়িতদের’ নিয়ে প্রথম দিন থেকেই শ্রীলঙ্কা সরকার ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে একের পর এক বিপরীতধর্মী বক্তব্য উঠে আসছে। ঘটনার আকস্মিকতা ও ভয়াবহতার চাপে ‘অপরাধী’ শনাক্ত করার বিষয়টি নিয়ে দৃশ্যত লেজে গোবরে এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এতে করে কি ঘটনার সঙ্গে যুক্ত প্রকৃত অপরাধীদের গা ঢাকা দেওয়ার পথ তৈরি হয়ে যায় কি না। ‘অপরাধীর’ পরিবর্তে ‘নিরাপরাধ’ কোনো গোষ্ঠী অন্যায় দোষারোপ ও ঢালাও আক্রমণের শিকার হয় কি না। আর এ হতবুদ্ধিকর আন্দাজ-অনুমান অপরাধী সাব্যস্তের প্রক্রিয়ায় বোমা হামলায় হতাহত মানুষের মতো নতুন করে অপর কোনো সম্প্রদায় বা গোষ্ঠী হামলা-হয়রানি বা আক্রমণে বিপর্যস্ত হওয়ার ‘ দীর্ঘ প্রক্রিয়া’ শুরু হয় কি না । এমন কিছু হলে সেটা ওই হামলায় হতাহতের চেয়ে কোনো অংশে কম বেদনার ব্যাপার হবে না।

শ্রীলঙ্কা হামলার পরের দিন ওই দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘এ হামলার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের যোগসূত্র রয়েছে’। সোমবার সন্ধ্যার মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়লো, শ্রীলঙ্কা ভিত্তিক ‘ন্যাশনাল তাওহীদ জামাত আল ওয়াতানিয়া’ নামের একটি ‘উগ্রবাদী মুসলিম সংগঠন’ এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। দায় স্বীকারের এই খবরটি আবার দিয়েছে রাশিয়া ভিত্তিক সংবাদ সংস্থা –‘তাস’। তাস এ সংবাদের সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে আল আরাবিয়িা টিভি কর্তৃপক্ষের একটি টুইট । সেই টুইটে আবার কথিত দায় স্বীকারের বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।

এখানে প্রশ্নবোধক একটি ব্যাপার হচ্ছে, এত বড় মাপের হামলার ঘটনার দায় স্বীকারের খবরটি একটি টিভি চ্যানেল কেন টুইট করে দায় সারবে? যথার্থ খবর হাতে এলে ওই চ্যানেলের তো খবরটিকে খবরের মতোই প্রচার করার কথা ছিল। টুইট করে খবর বা মতামত দেয় সাধারণত গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট নয়- এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। টুইটের উদ্দেশ্য থাকে গণমাধ্যম যেন ওই টুইট বার্তা থেকে তাদের খবর সংগ্রহ করে নিতে পারে। এখানে দেখা গেল, একটি গণমাধ্যম নিজেই সংক্ষিপ্ত ও অস্পষ্ট একটি টুইট দিয়ে খবর জানাচ্ছে! খবর জানানোর ক্ষেত্রে এটা কেমন যেন রহস্যময় একটি রেওয়াজের সূচনা !

ঘটনার তৃতীয় দিন মঙ্গলবার শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী দাবি করলেন, শ্রীলঙ্কায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে নিউজিল্যান্ড ক্রাইস্টচার্চে হামলার প্রতিশোধ হিসেবে। স্পষ্টতই এ মন্তব্যের মধ্য দিয়ে ঢালাওভাবে মুসলমানদের দায়ী করার চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও এমন বক্তব্যের কয়েক ঘন্টা পর নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী শ্রীলঙ্কার এই প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্য উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, নিউজিল্যান্ডের ঘটনার সঙ্গে শ্রীলঙ্কার ঘটনার কোনো সম্পৃক্ততা খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এভাবেই শ্রীলঙ্কায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটনার ‘অপরাধী’ শনাক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে অনেকটা আন্দাজে-অনুমানে। কংক্রিট তথ্য-প্রমাণ নয়- আঙুল তাক করা হচ্ছে নানা রকম ‘মিল’, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে। সন্দেহের ভিত্তিতে ৩ দিনে শ্রীলঙ্কায় ৪০ জনের মতো মানুষকে আটক করা হয়েছে। রোববার সন্ধ্যার আগে ওই দেশের একটি মসজিদে ও মুসলিমদের দোকানে হামলার খবর প্রকাশ হয়েছে। জায়গায় জায়গায় সন্দেহ, আতঙ্ক ও হয়রানির মধ্যে পড়তে হচ্ছে দেশটিতে বসাবাসরত মুসলমানদের।

অপরদিকে মঙ্গলবার দুপুরের পর রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, শ্রীলঙ্কা বিস্ফোরণের দায় স্বীকার করেছে আইএস। আইএসের মুখপত্র ‘আমাক’ থেকে না কি দায় স্বীকার করা হয়েছে। তবে গণমাধ্যমগুলোই বলছে এই দায় স্বীকারের দাবির পক্ষে আইএসের পক্ষ থেকে কোনো প্রমাণ পেশ করা হয়নি।

শ্রীলঙ্কা ঘটনার ২৪ ঘন্টা পার হতে না হতেই এ ঘটনার সঙ্গে আই এসের কর্মকান্ডের ‘মিলের’ কথাটা আন্তর্জাতিক কোনো কোনো গণমাধ্যম বারবার বলছিল। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কর্তা ব্যক্তিদের ভাষায় শ্রীলঙ্কা বিস্ফোরণের ঘটনাকে কথিত ‘মুসলিম সশস্ত্র ঘটনা’ হিসেবে চিহ্নিত করতে দেখা গেছে আগে থেকেই। সেসব অভিযোগ ও তোড়জোড়ের সঙ্গে মিলিয়েই এখন ‘অপরাধী’ খোঁজার চেষ্টা চলছে বলে মনে হচ্ছে। সন্দেহভাজন হামলাকারীর একটি সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে। ওই ব্যাগ কাঁধে ব্যক্তিটির পরিচয় আসলে কী? সে কি নিশ্চিতভাবে হামলায় জড়িত হয়েছিল? সংক্ষিপ্ত ফুটেজ থেকে এসব বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। তারপরও নানা ব্যাখ্যায় জড়িয়ে, বলিয়ে ঘটনার দায় মুসলমানদের কোনো এক বা একাধিক গ্রুপের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। নিশ্চিত তথ্য –প্রমাণ না পেলেও গোষ্ঠী ও সম্প্রদায় কেন্দ্রিক ‘অপরাধী’ সাব্যস্তের মহড়াটা যেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এখন।

শ্রীলঙ্কা বিস্ফোরণে জড়িত কে? কারা ঘটিয়েছে এ মর্মান্তিক ঘটনা? একমুখি বিচিত্র খবর ও বিশ্লেষণের পরও গণমাধ্যমের শিরোনামে দেখা যাচ্ছে সংশয়ের আলামত। বোঝাই যাচ্ছে, কেউ নিশ্চিত হতে পারছে না অপরাধী সম্পর্কে। আবার এ-ও বোঝা যাচ্ছে, একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে বারবার টার্গেট করা হচ্ছে। এতে করে ‘অপরাধী’ ধরা পড়বে না কি অপরাধীকে আড়ালে যেতে দিয়ে নিরাপরাধ কিছু মানুষকে ‘বলির পাঠা ‘ বানানো হবে- সময়ই হয়তো বলে দেবে সে সত্য।