আল্লামা ইকবাল: জাগরণের পথিকৃৎ

191

শাহ মুহাম্মাদ খালিদ ।।

বিংশ শতাব্দীতে পাক-ভারত উপমহাদেশে মুসলমানদের যে অভূতপূর্ব জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল তার অন্যতম কারিগর আল্লামা ইকবাল (রহ)। একদিকে ব্রিটিশ এবং অন্যদিকে হিন্দুদের ক্রমবর্ধমান যে চাপ মুসলমানদের উপর সৃষ্টি হচ্ছিল সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা তিনি প্রদান করেছিলেন।

আল্লামা ইকবাল ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দের ৯ নভেম্বর পাকিস্তানের শিয়ালকোটে জন্মগ্রহণ করেন। ‌ তার জন্মতারিখ নিয়ে নানা মতামত থাকলেও পাকিস্তান সরকার উপরোক্ত তারিখটি অনুসরণ করে থাকে।

শৈশবে তার পড়ালেখার মূল গোড়াপত্তন হয়েছিল সৈয়দ মীর হাসান সাহেবের হাতে। প্রথমে তিনি বাড়ির নিকটবর্তী এক প্রতিষ্ঠান পড়তেন। একদিন সে অঞ্চলের বিখ্যাত আলেম সৈয়দ মীর হাসানের দৃষ্টি পড়ে তার ওপর। তখন সৈয়দ মীর হাসান তার পিতা শেখ নুর মোহাম্মদকে বললেন, এই ছেলেকে চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখো না। তাকে বহুমুখী শিক্ষা প্রদান করো, ভবিষ্যতে সে এই জাতির একজন বড় কর্ণধার হয়ে উঠবে।

পরবর্তীতে এই মীর হাসানের কাছেই তার পিতা তাকে সোপর্দ করেন। সৈয়দ মীর হাসান প্রশস্ততা ও কোমলতার সাথে তার তরবিয়ত করতেন। কারণ তার বিশ্বাস ছিল, একটা শিশুকে কঠোরতার মধ্যে আটকে রাখলে তার প্রতিভার বিকাশ যথাযথ হয় না। যদিও এই মীর হাসান এবং আল্লামা ইকবালের পিতা শেখ নুর মোহাম্মদ আলীগড়ের স্যার সৈয়দ আহমদ-এর অনুসারী ছিলেন। এই ওস্তাদের হাতে আল্লামা ইকবাল তার শৈশবের মৌলিক জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছেন।

১৮৯৯ সালে এমএ পরীক্ষায় পুরো পাঞ্জাব প্রদেশে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। বিশ্বখ্যাত ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন। পরবর্তী সময়ে জার্মানির মিউনিখ ইউনিভার্সিটি থেকে দর্শনে পিএইচডি লাভ করেন।

আল্লামা ইকবাল পাকিস্তান ফিরে এসে লাহোর ওরিয়েন্টাল কলেজসহ একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনার পাশাপাশি ওকালতি পেশা গ্রহণ করেন এবং জীবনের দীর্ঘ একটি সময় এই ওকালতি পেশার সাথে তিনি নিজেকে যুক্ত করে রাখেন।

মহাকবি আল্লামা ইকবালের জীবনের দুটি অংশ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি হচ্ছে তার রাজনৈতিক দর্শন এবং স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে তার তৎপরতা ও অবদান এবং অপরটি হচ্ছে তার কাব্য ও কবিতা।

শে’য়ের ও শা’য়েরী -এর অঙ্গনে উর্দু ও ফার্সি সাহিত্যে আল্লামা ইকবাল যে অবদান রেখেছেন তা তাকে এই দুই ভাষার অঙ্গনে অমর করে রেখেছে। কবিতার সঙ্গে দর্শণের এক অপূর্ব সহপথ নির্মাণ করেন। ছোটবেলায় মাঝেমধ্যে মুখে মুখে কবিতা বানিয়ে আবৃত্তি করতেন। কখনো কাগজে লিখে তা ছুঁড়ে ফেলে দিতেন।
তবে আক্ষরিক অর্থে তার মধ্যে কাব্যপ্রতিভার পরিস্ফুটন ঘটে যখন তিনি ১৬ বছর বয়সে মেট্রিক পরীক্ষা শেষ করেন। এরপর থেকে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত উর্দু কবিতাকে শিল্পায়ন ও অলংকরণের উচ্চ শিখরে পৌঁছে দেয়ার কাজে নিজেকে ব্যাপৃত রাখেন। তার কবিতার মধ্যে মানুষ ও মুমিনের আত্মপরিচয়, তাসাউফ এবং মুসলিম জাগরণের বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়েছে। তাসাউফকে কাব্য ও কবিতায় প্রকাশ করার ক্ষেত্রে আল্লামা জালালুদ্দিন রুমি থেকে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।

আজ পর্যন্ত আল্লামা ইকবালের কবিতাসমূহ নানারূপ বিপদ ও দুর্বিপাকে দিশেহারা মুসলিম জাতিকে আলোর পথ দেখিয়ে যায়। ইকবালের কাব্য সম্পর্কে প্রখ্যাত উর্দু কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ বলেছেন- ‘ইকবালের বাণীর প্রাণবন্ত ও শক্তির উৎস হচ্ছে তার কাব্য সৌন্দর্য। ইকবালের মতো আর কোনো কবি উর্দু কবিতায় ব্যঞ্জন ও স্বরবর্ণের এতখানি ধ্বনিবৈচিত্র সৃষ্টি করতে পারেননি। এ পদ্ধতির তিনিই উদগাতা। উর্দুকাব্যে তিনি নতুন ছন্দ প্রবর্তন করেন, প্রথম স্বার্থকভাবে নামবাচক বিশেষ্য ব্যবহার করেন এবং অসংখ্য নতুন শব্দ আমদানি করেন। ইকবালের অন্বেষা হলো বিশ্বজগৎ ও মানুষ, বিশ্বজগতের মুখোমুখি মানুষ। তার কবিতার শেষ কথা হলো : মানুষের কথা, মানুষের বিশ্বের কথা, মানুষের একক মর্যাদার কথা। এই মূল্যবোধ ইকবালের কবিকীর্তিকে একক মর্যাদায় অভিসিক্ত করেছে।( ইকবালের নির্বাচিত কবিতা, মুহম্মদ মাহফুজ উল্লাহ লিখিত ভূমিকা, পৃ. ৯)

বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে ভারতবর্ষের মুসলিম জাতি যে অন্ধকারের মধ্যে নিমজ্জিত ছিল, অন্ধকারের সেই আচ্ছন্নতা কাটিয়ে উঠে মুসলমানদের আত্মশক্তিতে জেগে ওঠার আহবান তিনি শুনিয়েছেন-

তুমি এক তরবারি, নিজের খাপ থেকে বাইরে এসো

বাইরে এসো, বাইরে এসো, বাইরে এসো

সম্ভাবনাকে ঢেকে ফেলা সব পর্দা ফেলো ছিঁড়ে

চন্দ্রকে নাও, সূর্যকে ধরো, নক্ষত্রকে পুষো

মোটকথা উর্দু কাব্য সাহিত্যের আলোচনা উঠলে সবার আগে যে নাম উঠে আসে তাহলে আল্লামা ইকবাল। এই অঙ্গনে তিনি যে অবদান রেখেছেন এবং স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্র তৈরীর পেছনে তিনি যে চিন্তাগত ভূমিকা রেখেছেন তার স্বীকৃতি স্বরূপ তাকে পাকিস্তানের জাতীয় কবি ঘোষণা করা হয়েছে যদিও তিনি স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্র দেখে যেতে পারেননি।

আল্লামা ইকবাল ছিলেন বর্ণিল রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী। অন্যান্য আরো অনেকের মত প্রথম দিকে তিনি হিন্দু ও মুসলিম মিলিয়ে একটি রাষ্ট্রের প্রবক্তা ছিলেন, যেখানে একই সাথে হিন্দু ও মুসলমান বসবাস করবে। মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের প্রয়োজন নেই। কিন্তু ১৯০৫ সালে ঘোষিত বঙ্গভঙ্গ আইন ১৯১১ সালে হিন্দুদের প্রচন্ড আন্দোলনে (যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অংশ নিয়েছেন এবং আমার সোনার বাংলা গানটি যে প্রেক্ষাপটে তিনি রচনা করেছিলেন) বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে যাওয়ার পর আল্লামা ইকবাল বুঝতে পারেন, হিন্দুদের সাথে একত্রে বসবাস করে মুসলিম জাতির পক্ষে তার প্রাপ্য অধিকার আদায় করা অত্যন্ত কঠিন ও দুরূহ কাজ। সংখ্যা ও অনুপাতে বেশি হিন্দুদের মধ্যে বসবাস করে ভারতের মুসলমানরা কখনোই শান্তি মতো দিন কাটাতে পারবে না।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে আলাদা স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা ভাবনা তাদের মাথায় আসে।

প্রথম দিকে তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করে নিজের কবিতা ও লেখনীর মাধ্যমে তিনি রাজনীতির যে পক্ষে অবস্থান করতেন তাকে সমর্থন করে যেতেন। তবে ১৯২৬ সালে পাঞ্জাব প্রদেশের মুসলিম লীগের সেক্রেটারি নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তিনি সক্রিয়ভাবে সশরীরে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। এলাহাবাদে মুসলিম লীগের এক সমাবেশে তিনি মুসলমানদের জন্য আলাদা একটি রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব করেন। উল্লেখ্য, তখন মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র হবে নাকি হিন্দু মুসলিম একত্রে বসবাস করবে সে ব্যাপারে হিন্দুরা একটি পক্ষে অবস্থান করলেও মুসলমানরা দু’পক্ষে ভাগ হয়ে গিয়েছিলেন। আল্লামা হুসাইন আহমদ মাদানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং তার নেতৃত্বাধীন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ কংগ্রেসের অবস্থানের পক্ষে অর্থাৎ হিন্দু-মুসলিম মিলিয়ে একটি রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। বিপরীতে আল্লামা আশরাফ আলী থানবী রহ., আল্লামা ইকবাল, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রমুখ ব্যক্তিগণ আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষপাতী ছিলেন। মানুষের চিন্তাধারাকে আলাদা মুসলিম রাষ্ট্রের পক্ষে আনার জন্য তিনি অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ফলে তাকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা বলা হয়। যদিও তিনি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রটি দেখে যেতে পারেননি। ১৯৩৮ সালের আজকের এই দিনে ( ২১ এপ্রিল) পাঞ্জাব প্রদেশের লাহোরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

পরিতাপের বিষয় হলো যে স্বপ্ন ও কল্পনাকে সামনে রেখে আল্লামা ইকবালসহ আরো অনেকেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষে কাজ করেছিলেন পরবর্তীতে পাকিস্তানের কর্ণধার মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তাদের সেই প্রত্যাশাকে বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। বরং পবিত্র কোরআন হাতে নিয়ে তাকে পাকিস্তানের সংবিধান হিসেবে ঘোষণা করলেও বাস্তবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের নেতারা সেই পথে না হেঁটে অন্যান্য সেক্যুলার রাষ্ট্রের মত করেই পাকিস্তানকে পরিচালনা করতে শুরু করেন। মূলনীতিগত-ভাবে ইসলামী আদর্শ অনুসরনের কথা বলা হলেও পাকিস্তান রাষ্ট্রটি আজও সেই ইসলামী শাসনব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত হয়ে আছে যার প্রেরণার কথা শুনিয়ে স্বাধীন পাকিস্তানের পক্ষে তারা মুসলমানদের জনমত গড়ে তুলেছিলেন। যে ইসলামী শাসনব্যবস্থার কথা বলা হয়েছিল, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় তৎকালীন পেক্ষাপটে তা অনেকটা সহজ ছিল। কিন্তু এই কাজটা তখন না করার কারণে বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন একটা পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বহু মত, বহু দল এবং মতের ভিন্নতাকে কেন্দ্র করে নিত্য হানাহানি পাকিস্তানের নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান করে যেদিন পাকিস্তান একটি ইসলামী রাষ্ট্র হিসাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে, বলা যায় সেদিন আল্লামা ইকবালের মতো ব্যক্তিদের স্বপ্ন, শ্রম ও সাধনাকে প্রকৃত সম্মান জানানো হবে।