দ্বিমুখী সংকটে ধর্মীয় অঙ্গন: নৈতিক পরিচর্যার বিকল্প নাই

328

আবু তাশরীফ ।।

ফেনীর সোনাগাজীতে নুসরাত হত্যার ঘটনাটির সময়ের কথা। ওই সময়টাতে একের পর এক চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় মাদরাসা-মসজিদের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জড়িয়ে নানা রকম অনৈতিকতার খবর প্রকাশ হয়। খবরের প্রাথমিক বর্ণনায় বেশির ভাগ ঘটনাই সত্য বলে মনে হয়েছে। এসব ঘটনার জের আপাতত শেষ হয়েছে, বলার সময়টা মনে হচ্ছে এখনও আসেনি।

এসব ঘটনা ও ঘটনার খবরের কারণে একটা দুধারা ছুরির নিচে পড়ে গেছে ধর্মীয় অঙ্গন। একদিকে সংঘবদ্ধ প্রচারনার ডামাডোল, ঘটনার বর্ণিল ও অতিরিক্ত ঘৃণাব্যাঞ্জক পরিবেশনা, একেকটি ঘটনার খবরের পাশাপাশি নানা ধারার গণমাধ্যমে ধর্মীয় অঙ্গনকে ঘায়েল করতে একতরফা আওয়াজ। অপরদিকে এসব ঘটনার সঙ্গে ধর্মীয় অঙ্গনের যত মুষ্টিমেয় লোকই যুক্ত হোক – সেটার বাস্তব ও দূরপ্রসারী ভয়াবহতার আতংক, ক্ষোভ ও যন্ত্রণা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে ধর্মপ্রাণ মানুষের মন।

যারা তসলিমার মতো ইসলামের শিক্ষা ও কর্মপ্রয়াসের আগাগোড়াই বিরোধী, তাদের মতলবী প্রচার ও আওয়াজের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অঙ্গনে যত প্রতিরোধ মানসিকতাই থাকুক, একথা তো মিথ্যা নয় যে, ধর্মীয় অঙ্গনে নৈতিক বিচ্যুতি কিংবা উৎপীড়নের মুহূর্মুহ ঘটনা কোনোভাবেই বরদাশতযোগ্য নয়। কল্পিত কথা বলছি, মসজিদ-মাদরাসা বিরোধী মতলবী সব আওয়াজ বন্ধ করে দিতে সক্ষম হলাম, কিন্তু নিজেদের অঙ্গনের স্খলন ও উৎপীড়নের চোরাগুপ্তা পথ বন্ধ করতে পারলাম না, নানা জায়গায় নানান কিছু ঘটা ও ঘটানোর মহামারী আটকাতে পারলাম না, তাহলে ধর্মীয় অঙ্গনের বিনাশের জন্য বাইরের আক্রমণের কোনো দরকার হবে না; নিজেরাই শেষ হয়ে যাব। শত্রুদের সব প্রোপাগান্ডা বন্ধ হয়ে গেলেও ভেতরে ভেতরে অঙ্গনের পচে যাওয়া-ধসে যাওয়া কিছুতেই ফেরানো যাবে না।

এসব অনৈতিক ঘটনা ও ঘটনার খবর দ্বিমুখী সংকটের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারে কী কী করা যায়-দায়িত্বশীল সব ব্যক্তি ও মহলের দ্রুত ভেবে চিন্তে পদক্ষেপ নেওয়া উচিৎ। ভেতরের রোগ সারানোটা এ ক্ষেত্রে যেমন অগ্রাধিকারের, তেমনি বাইরের বিদ্বেষী আক্রমণ প্রতিহতের চেষ্টাটাও কম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় না। তবে এই দুই সংকটের মধ্যে ভেতরের সমস্যার সমাধানের চেয়ে তুলনামূলক গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই হতে পারে না। গত কয়েকদিনে কয়েকজন বিশিষ্ট আলেম, অধ্যাপক, ব্যবসায়ী এবং দাঈর সাথে কথা হয়েছে। সবারই কথা, ধর্মীয় অঙ্গনের অনৈতিকতার ঘুনপোকাটাকে দমন করতেই হবে। নৈতিক পরিচর্যার জায়গাটাকে আরো জোরালো, দৃঢ় ও কঠোর করার কোনো বিকল্প আছে বলে কেউ মনে করেন না । কারণ দ্বীনী অঙ্গনের স্খলন ও উৎপীড়নকে সহ্য করে গেলে অথবা এ বিষয়ে শৈথিল্যের দরজা খোলা থাকলে এ অঙ্গনের আর বাকি থাকে কী! এসব প্রতিষ্ঠানের আর প্রাসঙ্গিকতাটাই থাকে কোথায়! দ্বীনের দুশমনদের কাছে এ অঙ্গনকে খাটো করতে নতুন আর কী আয়োজন লাগে!

অস্বীকার করার উপায় নেই, প্রযুক্তির বরাতে চূড়ান্ত অশ্লীলতার ব্যবস্থাপনা হাতের তালুতে চলে আসার পর চারিত্রিক স্খলন এখন সমাজের গোটা দেহেই ছড়িয়ে পড়েছে। পীড়ন, ধর্ষণ ও হত্যার পিলে চমকানো সব ঘটনার খবর প্রায় প্রতিদিনই সামনে আসছে। সামগ্রিক এই অবক্ষয়ের ছায়া ছড়িয়ে পড়ছে নানা দিকে । কাণ্ডজ্ঞানহীনতা মানুষকে পশুত্বের স্তরে কখনো কখনো নামিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু এতসব কিছু সত্ত্বেও ইসলামের চর্চা ও শিক্ষার কোনো অঙ্গনে এ জাতীয় স্খলন ও পীড়নের যে কোনো রকম ঘটনাই প্রচণ্ড বেদনাদায়ক, আস্থাবিনাশক ও হতাশাজনক। অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনার মধ্যে থাকা ধর্মীয় অঙ্গনের কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে তাই ঢালাও ছাড়ের মধ্যে যেতে দেয়া ঠিক হবে না। অভিযোগের ব্যাপারগুলি তো অবশ্যই, বিতর্ক ও কানাঘুষা চলতে থাকা সমস্যাগুলিরও কঠোর ও ইনসাফপূর্ণ সুরাহার উদ্যোগ নেওয়া দরকার। তা না হলে আস্থার সাদা দেয়ালটাই কেবল ভেঙ্গে পড়বে না, অঙ্গনের ভেতরে বাসা বাধা অপত্রিতার দুর্গন্ধ ঠেকানো যাবে না। আল্লাহ তাআলা সবাইকে হেফাজত করুন।

আর দ্বীনের উৎপাটনকামী শত্রুদের হাতে খোরাক এগিয়ে দেওয়া , প্রোপাগান্ডায় সমর্থন দেওয়া এবং তাদের মতলব পুরা করতে বাঁকা পথ তৈরি করে দেওয়ার ব্যাপারটাতেও সতর্ক থাকা উচিৎ। সমালোচনা, আত্মসমালোচনা, রাগ, ক্ষোভ, দু:খ-সবই দরকার। এরসঙ্গে আপাদমস্তক দ্বীনের দুশমনের উৎখাতবাদী প্রয়াস থেকেও তো বাঁচা দরকার। অনৈতিকতা থেকে তৈরী দ্বিমুখী সংকটেও দরকার দ্বিমুখী সতর্কতা। দরকার সংযম, পদক্ষেপ ও পরিচর্যার। নিজেদের অঙ্গনের ‘স্খলিত’ জনদের নিয়ে মাতামাতি করতে করতে নিজেও যেন স্খলনের দল ভারি করার মিছিলে যোগ না দিই-সেজন্যও প্রয়োজন নিজের ও নিজেদের আত্মশুদ্ধি, বিবেকের জাগরণ, অনুতাপ, ভীতি, দোয়া এবং আল্লাহ তাআলার দরবারে বারবার আত্মসমর্পণ।