গণহত্যার পর রুয়ান্ডায় যে কারণে বাড়ছে মুসলিম জনসংখ্যা

245

আবরার আবদুল্লাহ ।।

মানব ইতিহাসের ভয়াবহতম গণহত্যার অন্যতম রুয়ান্ডা গণহত্যা। ১৯৯৪ সালে ৬ এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত চলা এই গণহত্যায় ১০০ দিনে প্রাণ হারায় ৮ লাখ মানুষ। এই গণহত্যায় ৮ লাখ সংখ্যালঘু তুতসি নিহত হয়। বিপরীতে ১ হাজার সংখ্যাগুরু হুতু নিহত হয়। তবে ধারণা করা হয়, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ১০ থেকে ১২ লাখ। গণহত্যা পরবর্তী হুতু ও তুতসিদের মধ্যে রাজনৈতিক বিবাদ ও গৃহযুদ্ধে প্রাণ হারায় আরও ৫০ লাখ মানুষ। যে সংঘাত এখনও থেমে নেই।

প্রতীকী ছবি : সূত্র ইন্টারনেট

রুয়ান্ডার গণহত্যার সময় দেশটির ক্যাথলিক খ্রিস্টান গির্জাগুলো নোংরাভাবে তার সাথে জড়িয়ে যায়। গির্জায় আশ্রয় নেওয়া হাজার মানুষ প্রাণ হারানোর পেছনে খ্রিস্টান ধর্মগুরু ও নেতাদেরকেও দায়ি করেন অনেকে। গণহত্যার ভয়ঙ্কর সেই সময়ে তুতসিদের রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যা পরবর্তী রুয়ান্ডায় ইসলাম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

রুয়ান্ডার গণহত্যার সময় সে দেশের সাধারণ মানুষকে রক্ষায় মুসলমানের শান্তিপূর্ণ অথচ সাহসী ভূমিকা রুয়ান্ডার জনগণের মনে গভীর রেখাপাত করে। এই হত্যার পর আফ্রিকার সর্বাধিক খ্রিস্টান অধ্যুষিত দেশ রুয়ান্ডায় ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটছে।

৪৯ বছর বয়সী মাতাবারো সোলায়মান বলেন, ‘গণহত্যার পূর্বে আমি ছিলাম একজন খ্রিস্টান যাজক। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় গণহত্যা শুরু হওয়ার পর আমি বিশ্বাস ও মানসিক সংকটে পড়লাম। যখন দেখলাম, চার্চ যা শান্তি ও ঐক্যের কথা বলতো তা কসাইখানাতে পরিণত হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ শান্তি আর নিরাপত্তা আশায় গির্জায় আশ্রয় নিচ্ছিলো আর খ্রিস্টানরা চার্চের ভেতর মানুষ হত্যা করছিলো। বিপরীতে মুসলিমদের দেখলাম মসজিদে মানুষকে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিচ্ছে।’

১৮৮৪ সালে রুয়ান্ডায় ইউরোপীয় উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে রোমান ক্যাথলিক ধর্ম রুয়ান্ডার প্রধান ধর্মে পরিণত হয়।

কিন্তু গণহত্যার পর বিগত ২৫ বছরে বিকল্প ধর্মমত হিসেবে ইসলাম রুয়ান্ডায় জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। হাজার হাজার মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয়গ্রহণ করেছে এই সময়। দেশটির মোট জনসংখ্যার শতকরা ১২ ভাগ থেকে ১৫ ভাগে উন্নীত হয়েছে এই সময়ে।

তুতসিসদের বিরুদ্ধে এক দশকের পরিকল্পিত নির্মম প্রচারণার পর ১৯৯৪ সালে জাতিগত নিধন শুরু হয় সেখানে। সমাজে ঘৃণা এমন গভীরভাবে ছড়িয়ে ছিলো যে, প্রতিবেশী প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে, বন্ধু বন্ধুর বিরুদ্ধে হত্যাযজ্ঞে মত্ত হয়। মানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে আপনজনকে হত্যা শুরু করে।

মানুষ শেষ আশ্রয় হিসেবে, প্রভুর ঘর বিশ্বাসে চার্চে আশ্রয় নিয়েছিলো কিন্তু সেখানেই হাজার নাগরিককে হত্যা করা হয়। এমনকি রুয়ান্ডার সর্ববৃহৎ গির্জা সেন্ট ফ্যামিলিতে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, আশ্রয় নেওয়া ২ হাজার মানুষকে রক্ষার পরিবর্তে হত্যাকারীদের সহযোগিতা করেছিলো ‘পাদ্রী উইনচেসলাস মুন্সিয়াকা’। রুয়ান্ডার দক্ষিণ কিগালিতে অবস্থিত নাইমাতা চার্চ একটি গণকবরে পরিণত হয়। সেখানে ৫০ হাজার আশ্রয়প্রার্থীকে হত্যা করা হয়।

রুয়ান্ডার খ্রিস্টান গির্জাগুলোয় যখন মানুষ গণহত্যার শিকার হচ্ছিলো, রুয়ান্ডার মসজিদগুলো তখন সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা প্রদান করেছিলো। যা রুয়ান্ডাবাসীর চিন্তা ও চোখ খুলে দিয়েছে।

সোলায়মান আরও বলেন, রুয়ান্ডায় তখন মুসলিম সংখ্যা ছিলো খুব সামান্য। তাদের ক্ষমতা ও সামর্থ্য ছিলো সামান্য। কিন্তু তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো বিপন্ন মানুষকে সাহায্য করার। আমি তখন দেখেছিলাম, এই সামান্য সংখ্যক মুসলিম মানুষের সাহায্যে কী অসামান্য অবদান রেখেছিলো। (তার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছিলো এবং কণ্ঠ কাঁপছিলো)।

যখন সেই বিপজ্জনক মুহূর্তে মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেখলাম, আমি মনে মনে বললাম, হয়তো এটাই ইসলামের প্রকৃত রূপ, হয়তো এটাই ইসলাম যার সম্পর্কে মুসলিমরা বলে থাকে। আমি ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলাম।

খ্রিস্টান পাদ্রী সোলায়মান এখন ইসলাম প্রচারক। তিনি জনসম্মুখে খ্রিস্টান পাদ্রীদের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হন। গ্রামের পর গ্রাম সফর করেন ইসলাম প্রচারের জন্য।

সোলায়মানের পরেই বসেছিলো ইবরাহিম। রুয়ান্ডার গণহত্যার সময় তার বয়স ১৪ বছর। মিলিশিয়াদের আক্রমণে তার পিতাসহ পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হন। গণহত্যার পর সে তার পরিবারকে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। সোলায়মানের মতো গণহত্যার সময় মুসলিমদের আচরণ তার চিন্তার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

মাতাবারো সোলায়মান

ইবরাহিম বলেন, এপ্রিল ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় গণহত্যা শুরু হলে রুয়ান্ডার প্রধান মুফতি গণহত্যায় মুসলিমদের অংশগ্রহণ করতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষকে হত্যা করা ইসলামে নিষিদ্ধ। মুসলিমরা তুতসি পরিবারগুলোকে সাহায্য করে এবং তাদের আত্মগোপনে সহযোগিতা করে। মুসলমানের এই সহযোগিতা বিপুল সংখ্যক খ্রিস্টানকে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছে।

বারুসিমানা হুসাইন গণহত্যার স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমার বয়স তখন মাত্র চার বছর। আমি কোনোদিন মুসলিমদের কথা ভুলতে পারবো না। আমাকে তারা এক মাস মসজিদে গোপন করে রেখেছিলো। আমার সঙ্গে আরও চল্লিশ জন অমুসলিম ছিলেন। মুসলিম যুবক গণহত্যার বিভৎস দিনে প্রতিদিন বাইরে যেতো এবং আমাদের জন্য খাবার সংগ্রহ করে আনতো।

গণহত্যার ১০ বছর পর হুসাইন ও বাবা-মা ইসলাম গ্রহণ করেন।

রুয়ান্ডায় ইসলামের আগমন হয় ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে। তারা ইসলাম প্রচার করতে না এলেও তাদের আচরণ, লেনদেন ও মহানুভবতার কারণে বহু মানুষ ইসলামগ্রহণ করে এবং তারা রুয়ান্ডায় যথেষ্ট সামাজিক মর্যাদা লাভ করে। কিন্তু উপনিবেশিক শাসন শুরু হওয়ার পর তাদেরকে সব ধরনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়।

শেখ হাবিমানা বলেন, বেলজিয়াম রুয়ান্ডায় উপনিবেশিক শাসন শুরু করার পর মুসলিমরা তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার হারায়। নিজ দেশে তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়। উপনিবেশিক শাসকরা তাদেরকে খ্রিস্টান বিরোধী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে। এ সময় মুসলিমদের জন্য শিক্ষাগ্রহণ, ভূমির মালিকানা লাভ, সরকারি চাকরি ও স্বাধীনভাবে দেশের সর্বত্র যাতায়াত নিষিদ্ধ করা হয়।

স্বাধীনতার পরও মুসলিমরা সমাজে নানা বৈষম্যের শিকার হন। কারণ, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে উপনিবেশিক আমলে প্রতিষ্ঠিত ক্যাথলিক চার্চগুলো গভীর যোগাযোগ ছিলো।

শায়খ হাবিমানা বলেন, দুঃখজনক ব্যাপার হলো, মুসলিমদের মনে করা হতো বহিরাগত এবং তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেতে প্রান্তিকতার দিকে ঠেলে দেওয়া হতো। মুসলিম ও মসজিদ সম্পর্কে বিভিন্ন কু-সংস্কারের জন্ম হয় তখন সমাজে। যেমন, মসজিদ হলো অপশক্তির আশ্রয়কেন্দ্র, মুসলিমদের সঙ্গে হাত মেলানো উচিত নয় ইত্যাদি।

কিন্তু গণহত্যার পর রুয়ান্ডার মানুষের চোখ খুলে যায়। তারা বুঝতে পারে মুসলিমদের সম্পর্কে প্রচারিত তথ্যগুলো সত্য নয়। মুসলিমরা তাদের উত্তম আচরণ দিয়ে রুয়ান্ডাবাসীর হৃদয় জয় করে নেয়।

তথ্যঋণ : টিআরটি ওয়ার্ল্ড, রোর বাংলা, উইকিপিডিয়া