ইতিহাস ভুলেনি: অ্যাডলফ হিটলার

বিশ শতকের পৃথিবীতে স্বৈরশাসকদের তালিকায় জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাডলফ হিটলারের নাম থাকবে সবার উপরের দিকে। উগ্র জাতীয়বাদ, একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একক ক্রীড়নক এবং ইহুদিনিধনে তিনি ঘৃণিত হয়ে আছেন সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে। ক্ষমতার মোহে যিনি ইউরোপ ও আফ্রিকাজুড়ে নিজের সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্নে ছিলেন বিভোর; নিজের প্ররোচিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার ভয়ে সেই হিটলারের জীবন শেষ হয়েছিল আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে।

কাছের ইতিহাসের স্বৈরশাসকদের নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন অ্যাডলফ হিটলারের জীবনের একঝলক নিয়ে। লিখেছেন সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

বিজ্ঞাপন

 

জন্ম ও বেড়ে উঠা: অ্যাডলফ হিটলার ২০ এপ্রিল ১৮৮৯ সালে অস্ট্রিয়ার ব্রুনোঅ্যাম-ইন এ জন্মগ্রহণ করেন। বাবা আলোইস হিটলার এবং মা ক্লারা পোলজ-এর ৬ সন্তানের মধ্যে হিটলার ছিলেন ৪র্থ।

বাবার সঙ্গে হিটলারের মোটেও সদ্ভাব ছিল না, বরং ভয় পেতেন। কারণ তার বাবা নিজে একজন জারজ সন্তান ছিলেন বলে নিজের প্রতি নিজেই বিতৃষ্ণ ছিলেন। সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল বরাবরই শীতল। এই বাবাও মারা গেলেন ১৯০২ সালে। ছয় সন্তান নিয়ে মা পড়ে গেলেন অকুল পাথারে। এই পাথার থেকে তিনি আর উঠে দাঁড়াতে পারেননি, ১৯০৭ সালে তিনিও রোগে-শোকে পাড়ি জমান পরপারে।

এবার হিটলার স্বাধীন। আঠারো বছর বয়সে তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় চলে আসেন।

শিশু হিটলার

জীবনকে উপলব্ধি: খুবই কষ্টে কাটে ভিয়েনার দিনগুলো। ইচ্ছা ছিল চিত্রশিল্পী হবেন। এ ভাবনা নিয়ে দুটো আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার চেষ্টাও করলেন, কিন্তু হলো না। কিছুদিন কাটালেন কুলি-মজুর হিসেবে। রাত কাটাতেন স্টেশনে বা কোনো বাড়ির আঙিনায়।

এ সময়টাতেই তিনি প্রথম বীতশ্রদ্ধ হন ইহুদিদের প্রতি। তিনি দেখতেন, অস্ট্রিয়া এবং জার্মানির অধিকাংশ বড় বড় ব্যবসা-বাণিজ্য, কল-কারখানা কিংবা সংবাদপত্রের মালিক ইহুদিরা। তারা সংখ্যায় অল্প, কিন্তু সমাজের সবচেয়ে ধনী মানুষ তারাই। অথচ হিটলারের দিন কাটছে অনাহারে অর্ধাহারে। তার মা মারা গেছেন অর্থের অভাবে প্রায় বিনা চিকিৎসায়। তাকিয়ে দেখেন, জার্মান ও ভিয়েনা সমাজের অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র, মজদুরি করেও তাদের দিন গুজরান হয় না। বিজাতীয় ইহুদিদের বিলাসী জীবন এবং স্বজাতির এমন কপর্দকশূন্যতা দেখে বিদ্রোহ করে ওঠে হিটলারের মন।

ভিয়েনায় কয়েক বছর থেকে ১৯১২ সালে হিটলার চলে আসেন জার্মানির মিউনিখে। এর বছর দুয়েক পরই ১৯১৪ সালে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। তরুণ হিটলার যোগ দেন জার্মান সেনাবাহিনীতে। গায়ে-গতরে খুব একটা সুঠাম ছিলেন না, এ কারণে সৈনিকদের সাহায্যকারী হিসেবেই কাটে তার যুদ্ধের দিনগুলো।

ভবিষ্যদ্বাদী হিটলার

হিটলারের উত্থান: যুদ্ধ শেষ হলো। দেশজুড়ে দেখা দিল বেকারত্ব, বিশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক অস্থিরতা। সেই সময় প্রধান রাজনৈতিক দল ছিল লেবার পার্টি। তিনি সেই পার্টির সদস্য হয়ে গেলেন। দেখতে পাতলা হলেও হিটলার ছিলেন দারুণ বুদ্ধিমান। অল্পদিনেই পাকাপাকিভাবে পার্টিতে নিজের স্থান করে নিলেন তিনি। এক বছরের মধ্যে তিনিই হয়ে উঠলেন লেবার পার্টির প্রধান নেতা। ১৯২১ সালে দলের প্রতিষ্ঠাতা ড্রেক্সলারকে সরিয়ে হিটলার নিজে পার্টির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন।

হিটলার তার দলের নতুন নাম রাখলেন নাৎসি। ক্রমশই নাৎসি দলের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। জনপ্রিয়তার জন্য হিটলার বেছে নেন উগ্র জাতীয়তাবাদ, ইহুদিবিদ্বেষ এবং শোষণহীন সমাজের ফাঁকা বুলি। বক্তৃতাদানে হিটলারের জুড়ি ছিল না। একদিকে সমাজে যুদ্ধোত্তর দারিদ্র, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা; এই সুযোগে হিটলার ধীরে ধীরে নিজেকে পরিণত করেন জার্মানির একমাত্র ‘ত্রাতা’ হিসেবে। জার্মানির মানুষ পঙ্গপালের মতো তার মতাদর্শের পেছনে ছুটতে থাকে।

জনতাকে উদ্বুদ্ধ করতে জুড়ি ছিল না তার

জার্মানির ভাগ্যবিধাতা: ১৯৩৩ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিপুল ভোট পেলেন কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেন না। ফলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হিডেনবার্গ তাকে ক্ষমতা ভাগাভাগির শর্তে চ্যান্সেলর পদে অভিষিক্ত করেন।

এবার ক্ষমতা দখলের জন্য শুরু হলো তার ঘৃণ্য রাজনৈতিক চক্রান্ত। বিরোধীদের অনেকেই খুন হল। অনেকে মিথ্যা অভিযোগে জেলে গেল। বিরোধী দলের মধ্যে নিজের দলের লোক প্রবেশ করিয়ে দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরি করলেন।

ক্ষমতা গ্রহণের পর হিটলার তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের একে একে চাপের মুখে ফেলতে থাকেন। জুনের শেষের দিকে ভীতি প্রদর্শন করে জোরপূর্বক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেন। ১৪ জুন ১৯৩৩ সালে নাৎসি দলকে জার্মানির একমাত্র বৈধ দল হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

১৯৩৪ সালের আগস্টে হিনডেনবার্গের মৃত্যুর একদিন পূর্বে হিটলারের মন্ত্রিসভা রাষ্ট্রপতির পদ বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা চ্যান্সেলরের সাথে একীভূত করে একটি আইন পাশ করে। এই আইনের পর থেকে হিটলার একই সাথে সরকারপ্রধান, একমাত্র বৈধ দলের সর্বোচ্চ নেতা এবং জার্মানির চ্যান্সেলর পদে অধিষ্ঠিত হন। সরকারপ্রধান হিসেবে হিটলার সেনাবাহিনীরও সর্বাধিনায়ক হন।

জার্মানিজুড়ে শুরু হয় হিটলারের স্বৈরচারী শাসন। নিজের একক ক্ষমতাবলে তিনি বিরুদ্ধবাদী সকল ব্যক্তি ও মতকে নিপীড়নের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করতে থাকেন। হিটলারের বিরুদ্ধে কিংবা নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করা ছিল রাষ্ট্রদ্রোহ। মতপ্রকাশের সকল স্বাধীনতা হরণ করা হয়। কেউ সরকার বা প্রশাসনের বিরুদ্ধাচরণ করলে তার ঠিকানা হতো জেল কিংবা বন্দিশিবির।

আত্মগরিমায় বিভোর একজন স্বৈরশাসক

ইহুদিনিধন: ধনিকশ্রেণি এবং ইহুদিদের শায়েস্তা করতে ১ এপ্রিল ১৯৩৩ সালে হিটলার ইহুদিদের সকল প্রকার ব্যবসা-বাণিজ্য জাতীয়ভাবে বর্জন করেন। ১৯৩৩ সালের ৭ এপ্রিল ইহুদিদের সকল প্রকার রাষ্ট্রীয় চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। এছাড়া স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইহুদি শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ন্যায্য পেশা থেকেও তাদের অব্যাহতি দেয়ার আইন জারি করেন। ইহুদি ডাক্তারদেরও অ-ইহুদি রোগীর চিকিৎসা করা নিষিদ্ধ করা হয়। ইহুদিদের জন্য আলাদা পরিচয়পত্র তৈরি করা হয় এবং তাদের তা বহন করতে বাধ্য করা হয়।

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকে ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত নাৎসি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা প্রায় ৬০ লক্ষ ইহুদি যা তৎকালীন ইউরোপের মোট ইহুদীর দুই-তৃতীয়াংশ সহ আরও প্রায় এক লক্ষ নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে বলে প্রচলিত। হিটলারের ইহুদি নিধনের এই গণহত্যা ইতিহাসে হলোকাস্ট নামে পরিচিত। এ সকল বন্দিদের জোরপূর্বক নতুন নির্যাতন শিবির নির্মান কাজে শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা হতো। কখনো তাদের অনাহারে রেখে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অদ্ভুত সব পরীক্ষা নিরীক্ষা সহ নানা রকম অমানুষিক নির্যাতন করা হত।

শুধু ইহুদি নয়, ভিন্নমতাবলম্বী কিংবা শত্রুপক্ষীয় যে কোনো ব্যক্তিকে ধরে এনে নারকীয় সব কায়দায় নির্যাতন করা হতো এসব বন্দিশিবিরে।

দ্বিতীয় বিশ্বযু্দ্ধ এবং শেষ পরিণতি: অপরিমেয় ক্ষমতার দম্ভে হিটলার নিজে ইউরোপের একক স্বৈরাচার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ইউরোপ ও পশ্চিম আফ্রিকার বৃহদাঞ্চল নিয়ে তিনি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ নাৎসি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবেন। এই স্বপ্ন নিয়েই তিনি প্রথম পোল্যান্ড আক্রমণ করেন। ১লা সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে জার্মানির পোল্যান্ড আক্রমণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়। পোল্যান্ড আক্রমণের দুই দিন পর ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

মিউনিখে নাৎসি জেনারেলদের সঙ্গে

জার্মানির হিটলারের পক্ষে ছিল জাপান ও ইতালি, এদেরকে বলা হতো অক্ষশক্তি। অপরদিকে ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া, আমেরিকাসহ অন্যান্য রাষ্ট্র মিলে যে পাল্টা জোট করে, তার নাম হয় মিত্রশক্তি।  টানা ৬ বছর ধরে চলে ইউরোপজোড়া এই বিশ্বযুদ্ধ। ধারণা করা হয়, এই যুদ্ধে সামরিক-বেসামরিক প্রায় এক কোটি ১০ লাখ মানুষ নিহত হয়।

১৯৪৫ সাল থেকে জার্মানি বিভিন্ন রণাঙ্গনে পরাজিত হতে শুরু করে। মিত্রশক্তি দখল করতে থাকে ইতালি ও জার্মানির একেকটি শহর। এপ্রিল মাসে হিটলার বুঝতে পারেন তার পরাজয় আসন্ন। তিনি রাজধানী বার্লিনে তার কার্যালয় ছেড়ে একটি বাংকারে এসে আশ্রয় নেন।

এ মাসের ২৯ তারিখে তিনি তার দীর্ঘদিনের বান্ধবী ইভা ব্রাউনকে বিয়ে করেন। শত্রুর হাতে নিহত হওয়া অপমানের মনে করে বিয়ের পরদিনই দুজন একসঙ্গে আত্মহত্যা করে মারা যান। হিটলারের অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী তার মৃতদেহ বাংকারের বাইরে পুড়িয়ে ভস্ম করে ফেলা হয়, যাতে শত্রুবাহিনী তার মৃতদেহ অসম্মান করতে না পারে।

এর ঠিক দুদিন পর ২ মে ১৯৪৫ তারিখে মিত্রশক্তির হাতে জার্মানি আত্মসমর্পণ করার মধ্য দিয়ে শেষ হয় হিটলার ও তার নাৎসি বাহিনীর ইতিহাস।

বিজ্ঞাপন