অন্য কেউ (গল্প)

87

শামীম আহমাদ ।। 

ভাবতেও পারিনি শাকিলের সঙ্গে এভাবে আবার দেখা হবে। কেউ কি এতটা বদলে যায় !

হাবিব আমার বাল্য সহপাঠী। দু গ্রাম পরে ওদের বাড়ি। আমি ঢাকায়। ও কুষ্টিয়ায়। ক্লাস ফাইভ থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন। ছুটি-ছাটায় কালেভদ্রে দেখা হয়-হয় না। জীবন এখন ছড়িয়ে গেছে নানান ডাল-পাতায়- ভীষণ স্বার্থপরতায়। বহুদিন পরে গতকাল বিকেলে কিসের টানে যেন হাবিবের বাড়িতে গেলাম। কথায় কথায় এক সময় ধরে বসল, চল কুষ্টিয়া যাই।

-কেন?

-খাওয়ার আয়োজন আছে।

-কোথায়?

-মৌবনে।

-কারণ?

-প্রশ্ন রাখ। যাবি কি না বল!

একেতো বাল্যসাথীর কথা। তার উপর তাজী-ঘোড়ার এই দ্রব্যমূল্যের যুগে এত ফ্রি দেখেও মন যার টলে না- সে মহান সাধু-পুরুষ ধরাপৃষ্ঠে সুলভ নয়। আমি রাজি হলাম।

আমাদের গ্রাম থেকে শহর প্রায় বারো কিলোমিটার। ভ্যান-বাস মিলে মিনিট তিরিশের পথ। সন্ধ্যার আগেই পৌঁছে গেলাম। দোকানে দোকানে জ্বলে উঠেছে নীল-রঙিন অথবা শুভ্র-দুধের এনার্জি। সে আলোয় ভেসে ফুরফুরে মেজাজে ঢুকলাম মৌবনে। কিছু তরুণ-যুবক আমাদের উল্লসিত অভ্যর্থনা জানাল। এরা হাবিবের চেনা-জানা। ক্লাশমেটও হয়তো কেউ। তাদের কাছে আমি নতুন। আমার কাছেও তারা অপরিচিত। তবু পরিচয় পর্বে মনে হলো একজনকে আগে কোথাও দেখেছি। কিন্তু বহুক্ষণ স্মৃতি হাতড়িয়েও কিনারা পেলাম না। শেষে ভাবলাম- না, দেখিনি। মানুষের মতো কত মানুষই তো থাকে। এ আমার চোখের ভুল। মনের অলীক উদ্ভাস।

পরে আরো কজন আসায় আমাদের সংখ্যা আঠারোতে দাঁড়াল। হাইফাই মেন্যু। খাওয়া শেষে লাইব্রেরী মাঠে জমা হলো সবাই। চলল তাল-বেতালের উড়ো কথা। চটুল গল্প। কথায় কথায় সময় গেল। রাত হলো গল্পে গল্পে । ভাবলাম খাওয়া ও আড্ডা তো চুকল এবার মুফতে বাড়ি ফেরা যাক।

কথাটা হাবিবকে বলতেই ও হাঁক মেরে বলল, আরে অত ব্যস্ত হচ্ছিস কেন! আসল কাজই তো এখনো বাকি।

-বাকি কী! নগদই তো খেলাম।

-তুই চুপ কর। কুষ্টিয়া থাকিস না। এদের বিষয়আশয়ও জানিস না। আড্ডাসূচিতে এখনো গলা ভেজানো আছে। ভাড়া উসূলের ব্যাপারটাও রয়ে গেছে।

এত দূর! কিস্তু কারণ কি!! হাবিব সে খবর দিল না। বহু জিজ্ঞেসেও না। কেবল মাথা দুলিয়ে স্বর লম্বিয়ে রহস্যময় কণ্ঠে বলল, আছে! কারণ তো একটা আছেই!! কৌতুহলে মাথা আমার ধরে এল। ঘাপলা নেই তো কোনো!

রাত আরো বাড়ল। মায়াময় হয়ে উঠল পরিবেশ। এবার একটু কানাঘুষা। একটু গলা খাকারি। ট্যারে ট্যারে খানিক চাওয়াচাওয়ি। হায়! জাদুর মতো সহসা এদিক-ওদিক শুরু হলো রঙিন বোতলের উদ্ভব। প্রমাদ গুনলাম। শুধু কৌতূহল নিবারণে আর কি থাকা চলে! হাবিবকে একটু দূরে ডেকে বললাম, এই চল। বহুত কুচ হুয়া।

ও আমাকে একপাশে টেনে নিয়ে বলল, আরেকটু দাঁড়া না। বাড়ি তো যাবই। এলামই যখন… তখন…

-তুই কি এইসব খাবি!

-নাহ!

-তবে?

-টাকার ভাগ তো ছাড়া যায় না।

-টাকার ভাগ?

-তুইও জানিস, রাজনীতির কোনো দলেই আমি নই। নেতাদের সাথে শুধু তাল দিয়ে চলি। তাতে ভার্সিটির দলীয় অত্যাচার থেকে বাঁচা যায়। মাঝেমধ্যে নসীবে বিড়ি-সিগারেটও মিলে। এবার একটা বড় দান মেরেছে এরা।

-কী দান?

-বিশ্বরোডের গাছগুলো খেয়াল করেছিস? কেমন ফাঁকা ফাঁকা না! সেগুলো এরাই কাটিয়েছে। টাকা পেয়েছে অনেক।

-কত?

-আমি অত হিসাব জানি না। দু’চার দিনের হাত খরচ পেলেই আমার ফতেহ।

আমি উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, সে টাকাতেই বুঝি খাওয়া হলো?

-তো কার টাকায়!

আমার মাথাটা বোঁ করে ঘুরে উঠল। মোচড় দিয়ে উঠল পেট। বুক ঠেলে বমি আসতে চায়। জানতাম সব ফ্রির পিছনেই একটা অন্ধকার থাকে। কথাটা আমার বেলায় এ রকম কুৎসিতভাবে সত্য হলো! ভূতগ্রস্তের মত বলে উঠলাম, তুই থাক। আমি গেলাম ।

-আরে, কী কস! …..আচ্ছা ঠিক আছে। এখানে একটু দাঁড়া। আমি আসছি।

আমাদের সামান্য দূরে হালকা আলোআধাঁরিতে মউজে মেতে আছে তরুণ-যুবকের জটলাটি। হাবিব সে দিকে পা বাড়াল। সামান্য পরেই দুই তরুণসহ ফিরে এল। একজন সেই পূর্ব চেনা চেনা। হাবিব ওদেরকে যাবার কথা বলতেই দুজন একসঙ্গে না-না করে উঠল, আরে সবাই মিলে এক সাথে মজা করবেন। আনন্দ করবেন। চলে গেলে হয়!…

আমি আরেকবার ভাবিত হলাম। এই ঢঙ এই স্বর শুনেছি আমি। এই চেহারা একেবারে অদেখা নয়। হঠাৎ তরুণটির মোবাইল বেজে উঠল। এবার আমার স্মৃতি আমাকে আর আঁধার পথে ছেড়ে দিল না। মিহি সুরের টোনটি অসাধারণ। সুন্দর। অতীত বিস্মৃতির আঁধার আকাশে ঘটে গেল ক্ষণেকের স্মৃতিবিচ্ছুরণ। তবে উদ্ভাসিত হলো না সবকিছু। হাত বাড়িয়ে বললাম, আপনাকে মনে হয় কোথাও দেখেছি।

তরুণটি সপ্রতিভতার সাথে বলল, ইন্টারেস্টিং! কোথায়?

তা ঠিকমতো বলতে পারব না। তবে টোনের কথাটি শুধু মনে আছে। আর আপনারা সেদিন বোধহয় তিন জন ছিলেন।

হা হা। আমারও মনে পড়ছে কিছু। সম্ভবত ট্রেনের মধ্যে না? ভাবনার ভঙ্গিতে ঠোঁটে আঙ্গুল রেখে বলল তরুণটি।

হঠাৎ আমার স্মৃতিতে সমস্তই ভেসে উঠল। যেন টিভি স্ক্রিনের চলমান ছবি-

কুষ্টিয়ার উদ্দেশে কমলাপুর থেকে ট্রেনে চড়েছি। ছিট তখনো অনেকগুলি খালি। হঠাৎ তিন তরুণ হুড়মুড় করে উঠে এল। বসে গেল পাশের ছিটগুলোতে।

শাদা শার্ট।

নীল গেঞ্জি।

লাল পাঞ্জাবি।

একগুচ্ছ তরুণ। চুপ তাই থাকতে নেই। প্রেম আশা হতাশা রাজনীতি স্বদেশ প্রীতি বা প্রবীণদের মু-পাত এদের করতেই হয়। এরা ছাড়া কৌশলী সবজান্তা দেশে আর আছে কেউ! তরুণত্রয় হালকা চালের কিছু কথার পরেই যথাবিহিত প্রীতি-নীতি ও মুণ্ডুপাতে লেগে গেল। খোদার দেয়া মূল্যবান তারুণ্য বৃথা অপচয় কি চলে!

লাল পাঞ্জাবি বলল, সর্ব সম্মতিতে মন্ত্রী-এমপিদের বিনা শুল্কে গাড়ি আমদানির বিল পাশ হয়ে গেল রে। (কথার ফারাক্কা যেন খুলে দিল তরুণটি)

শাদা শার্ট হাত নেড়ে মুখ বাঁকিয়ে বলল, আরে ধ্যাৎ! এদের কথা মুখে আনাও পাপ। পেটপূজারী সব। জনগণের কল্যাণে কোনো বিল পাশ হতে কত গড়ি মসি। একজন হ্যাঁ বলে তো ছয়জন করে টালবাহানা। অথচ নিজেদের স্বার্থে ষোলআনা।

দরাজ কণ্ঠে নীল শার্ট (শাকিল) বলল, ঘরে চালচুলা নেই অথচ রাজনীতি করলেই পেটে চর্বি জমে। চেহারায় তৈল চকচক করে। গাড়ি হয়। বাড়ি হয়। এরা না কি দেশ ও দশের সেবক। পরের টাকা নিয়ে কাড়াকাড়ি। ভাগ নিয়ে মারামারি। দেশ যেন বাপের পৈতৃক সম্পত্তি। একেবারে সবগুলো কু…।

লাল শার্ট, রাজনীতিটাই এখন কলুষিত হয়ে গেছে। এর মতো নোংরামি জোচ্ছুরি আর কিছু নেই। দেশের বারোটা বাজাল এই অসাধু রাজনীতিবিদরাই।

নীল গেঞ্জি (শাকিল) লাল শার্টকে সমর্থন করে, ঠিক বলেছিস। মুখেই শুধু দেশদরদী। সমাজসেবক। বাস্তবে জনগণের চাল-গম ওদের পেটেই চালান হচ্ছে। মন চায় সবগুলোর ঘাড়ে ধরে ড্রেনে চুবাই। দেশসেবা শিখিয়ে দিই। ভীষণ আফসোস হয়- দেশে আদর্শ কোনো নেতা-নেত্রীই কি আর জন্মাবে না! দুঃখ হয়। আক্ষেপ হয়। আর ইচ্ছে হয় ওদের ধরে…।

নীল গেঞ্জি হাত ও নখের আকৃতিতে একটা খারাপ জিনিসের প্রতি ইঙ্গিত করল।

শাদা এবার বড় খেদের সাথেই বলল, শালার এই সচিব-কর্মচারিরাই কি কম জা…!

নীল (শাকিল) মাথা নেড়ে বলল, এরা তো ঘুষ ছাড়া কথাই বলে না। আরে বাবা সরকার তো তোরে টাকা দিয়েই রাখছে। আবার পরের টাকা – গরীব অসহায় খেটে খাওয়া মানুষের টাকার উপর অত লোভ কেন। এরাই দেশকে ডুবাল। সবগুলে একদম ভাগাড়ের পাকা শু…।

লাল নীলকে থামিয়ে লাল বলে উঠল, আরে বাবা, এদের কোনো বাছ-বিচার নেই। কোটি টাকা থেকে এক টাকা – সব নেয়। চা-বিস্কুট বিড়ি সিগারেট সব খায়। আমার মনে হয় টাকার সাথে … (গ-য়ে উ কার) মিশিয়ে দিলেও নিবে এরা। গন্ধমন্দ কেয়ারই করবে না।

কথ্য-কথার এই সাগর-স্রোতে আমি বৈঠাহারা মাঝির মতো কোনো থৈ পাচ্ছিলাম না। একেবারে অপাংক্তেয় বেকুব শ্রোতা। এদিকে যুৎ মতো কোনো কথাও মুখে যোগাচ্ছিল না। তাদের মতো দুপাতা পড়া-জানা এবং দেশের প্রতি ক ফোঁটা ভালোবাসা আমারও যে আছে- কোনো কৌশলেই আমি তা প্রকাশ ঘটাতে পারছিলাম না। মনে মনে ভীষণতাড়িত হচ্ছিলাম। অপমানিত বোধ করছিলাম। তরুণত্রয়ও যেন ব্যঙ্গ মনে আমার সেই অজ্ঞতার অপমান অনুভব করছিল। আমার কী যে দশা!

আমি শব্দ খুঁচ্ছিলাম। বাক্য খুঁচ্ছিলাম। তথ্য খুঁচ্ছিলাম। ভিতরে ভিতরে মরিয়া হয়ে উঠছিলাম। অপাংক্তেয় বোকার মতো এভাবেই কি বসে থাকব! শেষমেষ আকাশ-পাতাল ভেবে জাতে উঠার আশায় একফাঁকে বলে ফেললাম, দেশের ব্যবসায়িরাও কিন্তু ভালো করছেন না। তারা জনগণের কল্যাণের….

আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে লাল বলে উঠল-

ব্যবসায়ীদের কথা বলছেন? ওরা তো আস্ত ডাকাত। সরকারকে ফাঁকি দেয়। জনগণকে ঠকায়। গোঁফে তাও দিয়ে দাম বাড়ায়। হাজারটা অপকর্ম করেও টাকার জোরে পার পায়। আর হাউজিং কম্পানিগুলি তো এখন অন্যের জমি দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। টাকার প্রাসাদ গড়তে গিয়ে লাখো মানুষের স্বপ্ন-সুখের নীড় ভাঙছে।

নীল বলল, দূর! বল যে ব্যবসায়িরা হলো বজ্জাতের গোড়া। পাজির হাড্ডি। সুদখোর। রক্তখোর। এরা গরিব আর মধ্যবিত্তের পেটে লাথি মেরে নরম গালিচায় সুখের গা হেলায়। মাঝেমধ্যে মনে হয় এদের প্রাসাদগুলিতে আগুন দিই। দয়ামায়ার ধূলিকণাও যদি থাকে এদের মনে। এদের মতো পাক্কা জা….দেশে আর নেই।

ট্রেনের গতির তালে কথা তাদের চলতে থাকে। একে একে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার শিক্ষক উকিল এসপি ডিসি পুলিশ- সবাই তাদের বিশ্লেষণ-জালে ধরা পড়ে। বিশ্লেষিত হয় এবং যথারীতি পূর্ববৎ উচ্চারণঅযোগ্য বিশেষণ থেকেও রেহায় পায় না কেউ।

আমি তো আগেরই সেই বৈঠাবিহীন মাঝি। কূলহারা তরী। অপাংক্তেয় বেকুব শ্রোতা। ‘ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক’ নামক বইটি কিছুদিন আগেই পড়েছিলাম। তারই মজমারোচক টাটকা কিছু তথ্য মাথায় আঁকুপাঁকু করছিল। ঠিক করলাম আমাদের সাথে ভারতের শত্রুপ্রতিম আচরণগুলি আলোচ্যে তুলি। জাতে উঠার চেষ্টায় মানুষ কত কিছুই তো করে। গলা পরিস্কার করে শুদ্ধ উচ্চারণে বললাম, আমাদের এতসব অধঃপতনে ভারতেরও কিন্তু হাত আছে। তারা বহুভাবে …

তা তো বটেই, লাল বলে উঠল। এ তো দিবালোকের মতো স্পষ্ট। আর ধ্রুব তারার মতোই সত্য।

নীল (শাকিল), দেখছেন না, তাদের সীমানা আমাদের তিন দিকে। ক্ষতি করছে চারদিকে। আমাদের শিল্প-অর্থনীতি সাহিত্য-সংস্কৃতি নষ্ট হচ্ছে তাদের দরদি দিলের ষড়যন্ত্রে। নেশার লাল পানি সরবরাহ করে রোজই। কিন্তু বছর চলে যায়,নদী শুকিয়ে চিকচিক, বন্যা বর্ষা ছাড়া ফারাক্কার পানি ছাড়ে না। তাদের ডাম্পিং নীতির ফলে বহু কল-কারখানা তো বন্ধ হয়েই গেছে। মৃত্যুজ্বরে বাকিগুলি ধুকধুক। ওরা সীমান্তের রক্তখেকো। আমরা তাদের ঈগলের মতো নখর-মুঠে। ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে বাংলাদেশের রক্ত-মাংস। এই না হলে প্রতিবেশীবন্ধু!

শাদা এবার নাটকের ঢঙে বলল, বন্ধুটন্ধু সব ভাওতাবাজি। ওরা চায় আমাদের মাথার উপর ছড়ি ঘোরাতে। ওরা চায় দেবতার পায়ে মুগ্ধ পূজারীর প্রসাদ হাতে লুটিয়ে পড়া।…….

শাদা শার্ট

নীল গেঞ্জি

লাল পাঞ্জাবি

ভারত বিষয়ে তরুণত্রয়ের শক্ত-সরল উপসংহারে, পাথরকঠিন মন্তব্য চাপে আমার বই পড়া ‘তথ্য-তত্ত্ব’ লেজ আটকে মিঁউ মিঁউ করে কাঁদতে থাকে। কল্কে আমি এবারও পেলাম না। হাল তবু ছাড়তে চাই না। টিপাই বাঁধ সম্পর্কে চম্বুকতথ্য তখনো আমার কাছে একটা ছিলো। মনে মনে কথাটা গুছিয়ে নিলাম। পাছে আবার ভুল বলে হাসির পাত্র না হই। কথাটা বলব বলব করতেই ট্রেনটি ইয়ারপোর্ট স্টেশনে এসে থামল। শাদা লাল নীল নামার জন্য নড়েচড়ে উঠল। এবং এক স্বপ্নঘোর বিহ্বলতা থেকে এতক্ষণে যেন আমরা জেগে উঠলাম । চারপাশ দেখলাম এবং একে অপরের সাথে পরিচিত হওয়ার ফুরসৎ পেলাম। অন্যদের মত নীলও হাত বাড়িয়ে বললো, আমি শাকিল। সমাজ কল্যাণ। মাস্টার্স। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কুষ্টিয়া।

আমি অপরিমিত আনন্দে ঠিক বিস্ময়ের মত বলে ফেললাম ‘তাই’! আমার জেলাও কুষ্টিয়া।

-ভেরি ফাইন। কোন থানা?

-সদর থানা।

-গ্রাম?

-আলামপুর।

-ওয়েল। আমার বাসা থানাপাড়া। বাবার নাম সিরাজুল ইসলাম। চন্টু এমপি সাহেবের সাথে রাজনীতি করেন।

আমি ছোটবেলা থেকে ভিন্ন জেলায়। নিজের জেলার, এমন কি গ্রামের মানুষকেই ঠিক মতো চিনি না। রাজনীতির বিষয় আরো বুঝি না। হাতেগোনা খ্যাত আলোচিত ক জন ছাড়া তাদের কাউকে চিনিও না। অথচ শাকিলের কথার ভাবে বুঝলাম সিরাজ সাহেব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাকে না-চেনা লজ্জাকর। সঙ্কট-মহা। শেষে চেনা না-চেনার মাঝামাঝি বিশেষ এক কায়দায় মাথা নাড়লাম।

সময় ছিল না। ট্রেন ছেড়ে দিবে। ওদের নামতে হলো। নামার আগে শাকিল বলে গেল, আসি তবে। আবার দেখা হবে।

বাকি পথের সারাটা সময় এক স্বর্গীয় অনুভবে বুক আমার ভরে ছিল। আশার জোনাকিগুলো চোখে আমার রঙিন আলো ছড়াচ্ছিল। কী মধুর স্বপ্নেই না চোখে আমার রংধনু ভেসেছিল।

দেশে বর্তমান দুর্নীতিবাজদের দ্বারা যে কিছু হবে না, তা দিবাসূর্যের চেয়েও সত্য। দেশ-জাতির উন্নতির জন্য যে মেধা মস্তিষ্ক আর দরদ দরকার এমন তিন নক্ষত্রের সাক্ষাৎ পেয়ে মনে সুখ পাচ্ছিলাম। মানি, তাদের বিশেষণ প্রয়োগে মাঝেমধ্যে শালীনতা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এও তো সত্য- বহুদিনের ঘণীভূত ক্ষোভ প্রকাশের পথ পেলে মুখের লাগাম ছিঁড়ে যায়। দেশ ও জাতির প্রতি তীব্র গভীর ভালোবাসার কারণেই এমনটি হয়েছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে অগ্রগামী মধ্যমণি সক্রিয় তরুণটি আবার আমারই জেলার। একই থানার। ভারি গর্ববোধ হচ্ছিলো আমার।

প্রায় বছর খানিক পরে গর্বপাত্র সে শাকিলের সঙ্গে এ আমার দেখা। সত্যিই দ্বিতীয় দেখা। জ্ঞানগর্ভ স্বদেশপ্রেমী তরুণকে এ পরিবেশে অবশ্যই আমার ভালো লাগে নি। এরুপ দেশদরদী রাস্তার গাছ কেটে নেশায় বুদ হবেÑ সেও আমার কল্পনায় ছিল না। নাকি আমার মতো সেও এখানে নিছক অতিথি। কারো পাল্লায় পড়ে এসেছে কেবল। আলাপ শেষে ফেরার পথে হাবিবকে জিজ্ঞেস করলাম, শাকিলকে আগে থেকে চিনিস?

কী যে কস! এ সবের মূল হোতাই তো শাকিল। মামুন এদিকে কাজ করে। শাকিল ঢাকা থেকে ম্যানেজ করেÑ মাঝেমধ্যে আসে। সমস্যা হলে এমপির মাধ্যমে ওর বাবাই সব ট্যাগেল দেয়।

আমি হতভম্বের মতো বললাম, সত্যি!

তো, বানিয়ে বলছি! গড়াই ঘাটের চাঁদা, জিকি বাঁধের টেন্ডার, হাসপাতালের ঔষধ পাচার, যার-তার উপর হুমকি-ধামকি – সব এদের কর্মসূচী। শুনা যায় মুনির হত্যার পিছনেও…

বুকের এক পাশে হাজারটা স্বপ্ন ভাঙার শব্দ পেলাম। হায় খোদা! মুখোশমানুষের পরিসখ্যান শুধু তুমিই জানো। আমি পেট ও মাথার মোচড় নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। অনেক চেষ্টা চরিত্রেও রাতে ঘুম এলো না।