হামিদ মীর এবং অন্যান্য উর্দু কলামের ভাষা, আমার উপকৃতি ও অভিজ্ঞতার কথা : ড. ইমতিয়াজ বিন মাহতাব

138

[উপমহাদেশে উর্দু পত্র-পত্রিকায় ইসলামি শিক্ষা, আদর্শ এবং মানুষ ও মানবতার কাছে ইসলামের সত্য সুন্দর অবদান ও আবেদন কাদের কলাম-রচনায় ব্যাপকভাবে উল্লেখ থাকে-এ বিষয়ে ইসলাম টাইমসের পক্ষ থেকে আমরা কথা বলি উর্দু  কলামের বিশিষ্ট অনুবাদক ও শিক্ষক এবং রাজশাহীর রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট মসজিদের খতিব ড. মাওলানা ইমতিয়াজ বিন মাহতাবের সঙ্গে। তার সেই কথামালা নিয়ে আমাদের এই মুখকলাম।]


 

প্রখ্যাত সাংবাদিক হামিদ মীরের গ্রহণযোগ্যতা আমাদের দেশে ডান-বাম উভয় পাড়াতেই আছে। ওলামায়ে কেরামও তার কলামগুলো পছন্দ করেন। আফগান ইস্যু, মালালা, লাল মসজিদ ট্র্যাজেডিসহ বিভিন্ন সময় তার কলামগুলো বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে। দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকাও মাঝে মাঝে তার অনুবাদ ছাপে।

আমি হামিদ মীরের কলামের প্রতি মনোযোগী হই ২০১২ সালে। ওই বছর থেকেই আমি তার লেখা অনুবাদ শুরু করি। হামিদ মীরের নামে প্রথম আলোতে আমরা যে লেখাগুলো পড়তাম ওটাই আসলে হামিদ মীরের সবটুকু না। হামিদ মীরের কিছু পজেটিভ দিক আছে। যেমন জিহাদ ও সন্ত্রাসকে তিনি আলাদা করে দেখেন। এবং লেখায় তিনি এ দুটিকে আলাদা বিষয় হিসেবেই উল্লেখ করেন।

প্রথম আলো হামিদ মীরের লেখার জিহাদ ও সন্ত্রাসের পার্থক্যটা মুছে ফেলে। তারা এ বিষয়টা কৌশলে চেপে যায়। হামিদ মীরের কলাম পরিবেশনের সময় তারা জিহাদ ও সন্ত্রাসের পার্থক্যটা রাখে না। এ বিষয়টা আমার নজরে ধরা পড়ে মালালার বিষয়ে হামিদ মীরের একটা লেখা পড়তে গিয়ে।

২০১২ সালে পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাইর ঘটনা মিডিয়ার বদৌলতে বিশ্বব্যাপী আলোচিত। আমি মালালার বিষয়ে হামিদ মীরের লেখা একটা কলাম পড়লাম। ওই কলামটাই অনুবাদ করে প্রথম আলো ছাপিয়েছে। কিন্তু দেখলাম, হামিদ মীরের লেখার শুরুর দিকের অনেকটুকু অংশ নেই। মাঝখান থেকে এমনকি বিভিন্ন জায়গা থেকেও কিছু কিছু অংশ তারা বাদ দিয়ে দিয়েছে। সেইসঙ্গে ওটার মধ্যে কিছু লেখা ও কথা নিজেরা যুক্ত করে দিয়েছে।

নয়া দিগন্তের সঙ্গে আমার যোগাযোগ স্থাপিত হলো। এরপর থেকে নিয়মিতভাবে আমার অনূদিত হামিদ মীরের লেখা নয়াদিগন্তে প্রকাশিত হতে লাগল। একটা বিষয় খেয়াল করলাম, আমি অনুবাদ শুরু করার পর প্রথম আলো হামিদ মীরের লেখা ছাপানো কমিয়ে দিয়েছে। যেখানে তারা আগে নিয়মিত ছাপত, সেখানে তারা একদমই সীমিত করে ছাপে বা ছাপেই না বলা যায়।

হামিদ মীরের সাংবাদিকতার একটা বিষয় তো হলো, তিনি ঘটনার মূলে চলে যান। পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই ইনসাফের সঙ্গে নির্মোহভাবে ঘটনার বিশ্লেষণ করেন। কিন্তু তার কলামের বড় ও আকর্ষণকারী দিকটা হলো, তিনি লেখার মধ্যে ইসলামের ইতিহাস ও ঘটনাকে প্রাসঙ্গিক করে তোলেন।

আফগানিস্তানে সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে তালেবানদের সংগ্রামকে গোটা বিশ্ব যখন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলে আখ্যায়িত করে ইসলাম ও মুসলমানদের দোষারোপ করছিল, তখন যে কজন বিবেকবান সাংবাদিক এর ঘোর বিরোধিতা করেছেন তাদের মধ্যে হামিদ মীর অন্যতম। তিনি পশ্চিমা মিডিয়ার মিথ্যাচারের প্রতিবাদ করেছেন। বিভিন্ন ইস্যুতে এখনও করেন। প্রায় লেখাতেই তিনি এ বিষয়টা পরিষ্কার করে বলেন, জিহাদ ও সন্ত্রাস কখনোই এক না। বরং ইসলামে জিহাদ হলো সন্ত্রাস নির্মূলের জন্য। তিনি বলেন, আফগান ও কাশ্মিরে যারা সংগ্রাম করছেন তারা নিজেদের অধিকার এবং দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সংগ্রাম করছেন। এটা কোনো সন্ত্রাস নয়। তাদের এই সংগ্রাম কোনোভাবেই সন্ত্রাসী কার্যক্রম নয়।

উর্দু সাংবাদিকতা ও কলামে হামিদ মীরের পাশাপাশি ভারতের একজন প্রবীণ সাংবাদিক আছেন মাসুম মুরাদাবাদি। আমি তার লেখার প্রতিও মুগ্ধ। তিনি ভারতের মতো দেশে থেকে আরএসএস ও মোদী সরকারের ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের ঘোর সমালোচনা করেন। তার কলামগুলোও শক্তিশালী। আমি তার অনেকগুলো লেখা অনুবাদ করেছি। বিশেষ করে বাবরি মসজিদকেন্দ্রিক। ভারতে গরু জবাইকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের ওপর যে নিপীড়ন ও নির্যাতন হয়েছে এ বিষয়ে তিনি কঠোর প্রতিবাদী কলাম লিখেছেন।

ভারতের আরও দুজন লেখক আছেন রশিদ আনসারি ও ফারুক আনসারি। তাদের লেখাও ভালো লাগে। এরাও বেশ প্রতিবাদীমূলক লেখা লেখেন। মুসলমানদের পক্ষে এবং স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে। ভারতের মুসলমানদের বর্তমান অবস্থান, মৌলিক ও নাগরিক অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়গুলো তাদের কলামে উঠে আসে। আমি চেষ্টা করি তাদের রচনা থেকে আমাদের জন্য উপযোগী লেখাগুলো বাংলায় অনুবাদ করতে। মুসলিম স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাদের লেখাগুলো যেমন সাম্প্রতিক ও প্রাসঙ্গিক হয়, তেমনি লেখাগুলো হয় অনেক ওজনদার ও যুক্তিগ্রাহ্য। কোনো কোনো লেখা এমনও থাকে, যেগুলো আমাদের দেশের লেখকদের জন্য লেখার সাহস বা পরিবেশ নেই।

সারা দুনিয়ার মানুষই এখন আধুনিক। তারপরও ভারত-পাকিস্তানের কোনো কোনো পত্রিকা ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন ও দায়িত্ববান। তারা ইসলামি আদর্শ, ইসলামি শিক্ষা এবং মানুষ ও মানবতার কাছে ইসলামের অবদান ও আবেদন সুন্দরভাবে তুলে ধরেন। এ বিষয়ে তাদের কার্পণ্য কম। কিন্তু আমাদের দেশের গণমাধ্যম বা পত্রিকাগুলো এ ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। বাংলাদেশ মুসলিম দেশ। তারপরও আমাদের পত্রিকাগুলোতে ইসলামি পাতা ছাড়া অন্য পাতাগুলোতে ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আমাদের তেমনভাবে চোখে পড়ে না।

ভারত-পাকিস্তানের মুসলিম সাংবাদিকদের বেশির ভাগ কলাম ও রচনাতেই আপনি কোরআন-হাদিসের উদ্ধৃতি পাবেন। ইসলামি ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং মুসলমানদের সুন্দর ও শিক্ষণীয় ঘটনাবলি পাবেন। তারা ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে অকপটে উল্লেখ করেন। এক্ষেত্রে তাদের কোনো দ্বিধা বা সংশয় নেই। বরং শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে তারা তাদের লেখার মধ্যে ইসলামকে নিয়ে আসেন। মানুষের সামনে তুলে ধরেন।  কিন্তু আমাদের দেশের সাধারণ কলামগুলোতে কি আমরা এটা খুব একটা দেখতে পাই?

উর্দু ভাষার যেসব পত্রিকা পড়ি তার মধ্যে ভারতের উর্দু টাইমস আছে। এ ছাড়া মুম্বাইয়ের ইনকিলাব আছে। পাকিস্তানের দৈনিক জং, নাওয়ায়ে ওয়াক্ত, ইসলামি দুনিয়া ইত্যাদি পত্রিকাগুলো পড়ি। উর্দু বিবিসিও দেখি। তথ্য বা কোনো বিষয়ের বিস্তারিত জানার জন্য। কিন্তু ওটাকে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য সবক্ষেত্রে আমানতদার ও বিশ্বস্ত মনে হয় না আমার কাছে। বিবিসি কৌশলে ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের বিরুদ্ধে একটা লাইন বা শব্দ প্রয়োগ করার সুযোগ পেলে ছাড়ে না। এই কাজটা তারা অহরহ করে। সাধারণ মানুষের পক্ষে এটা সহজে ধরতে পারার কথা না।

ভারত-পাকিস্তানের অনেকেই মুসলিম স্বার্থসংশ্লিষ্ট কলাম লেখেন। আন্তর্জাতিকভাবে ইসলাম ও মুসলিমদের ধারণ করা লেখার পরিমাণ সব দেশেই কম। উর্দু ভাষায়ও কম। তাদের বেশির ভাগ লেখাই হয় দেশকেন্দ্রিক। তার পরও এর মধ্যে যাদের লেখা প্রায়ই পড়ি তাদের মধ্যে একজন আছেন পাকিস্তানের মুন্নু ভাই। তার লেখাগুলো থাকে কোরআন-হাদিসের উদ্ধৃতি সমৃদ্ধ।

আমি উর্দু কলাম অনুবাদ শুরু করি ২০১২ সালে। এ পর্যন্ত আমার অনূদিত উর্দু আর্টিকেলের পরিমাণ প্রায় ১৫০। এগুলো দিয়ে এখনো কোনো বই করিনি। লেখাগুলো যত্ন করে রেখে দিয়েছি। সামনে বই করব ইনশাআল্লাহ! কিছু কলামের বিষয় আছে বেশ সাহসী। হামিদ মীরের কোনো কোনো কলাম বেশ খোলামেলা ও সাহসী। যেটা তার দেশের জন্য স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশে ছাপতে হলে একটু বুঝেশুনেই ছাপতে হবে মনে হচ্ছে।

অনুলিখন : সাদ আবদুল্লাহ মামুন