খাশোগি মরিয়া প্রমাণ করিল, তার মৃত্যু লাভজনক

সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর  ।। 

মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে বর্তমান সংকট এবং পশ্চিমাদের দাবা খেলার একটি সহি চিত্র পেতে হলে লেখার শুরুতে আমাদেরকে একটি অমিয়বাণী শুনতে হবে- ‘মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়া কখনোই আমেরিকার তুল্য হতে পারে না।’

বিজ্ঞাপন

আমেরিকার প্রতিরক্ষা সচিব জেমস এন ম্যাট্টিস গতকাল শনিবার (২৭ অক্টোবর) মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বাহরাইনে আয়োজিত এক সেমিনারে এ কথা বলেন। তিনি যখন এ কথা বলছিলেন ঠিক তখন তুরস্কের প্রাচীনতম শহর ইস্তাম্বুলে শুরু হতে যাচ্ছিল তুরস্ক, রাশিয়া, ফ্রান্স ও জার্মানির শীর্ষনেতাদের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ সিরিয়ায় সরকারি ও বিবদমান সশস্ত্র গ্রুপগুলোর মধ্যে যুদ্ধবিরতি বিষয়ে আলাপ করার জন্য আয়োজন করা হয় এ বৈঠক।

তবে নিতান্ত মজার বিষয় হলো, সিরিয়া নিয়ে শান্তি আলোচনা হলেও সেই বৈঠকে সিরিয়ার কোনো প্রতিনিধি ছিল না। সিরিয়ার জন্য এটা অত্যন্ত সৌভাগ্যের বিষয়ই বলতে হবে যে তার শান্তির লক্ষ্যে বিশ্বনেতারা তাকে ছাড়াই নানা শান্তির কথা আলোচনা করছেন। সে এমনই গৌন এক দেশে পরিণত হয়েছে, তার ব্যাপারে কী করা হবে বা না হবে, সে ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞেস করারও প্রয়োজন হয় না এখন আর।

 

দুই

সবকিছুর গোড়ায় রয়েছে সেই জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে রয়েছে আমেরিকা-সৌদি সদ্ভাব এবং মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রভাব বজায় রাখার নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ। বলাই বাহুল্য, সৌদি ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে আমেরিকা এখন আর কোনো রাখঢাক বালাই রাখছে না। জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী আমেরিকার বিভিন্ন অফিসিয়াল ব্যক্তির বক্তব্যে সে মেজাজ স্বমহিমায় প্রকাশ পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তারাই যে ডিসিশন-মেকার, সেটা তারা নগ্নভাবে জানিয়ে দিচ্ছে।

এই জিনিসটা একদমই মানতে নারাজ তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান। মধ্যপ্রাচ্য এবং মুসলিম দেশগুলোতে আমেরিকার দাদাগিরিতে বিরাট নাখোশ তিনি, এটা বেশ আগে থেকেই। তার এই নাখোশিই জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডে সৌদি আরব এবং সৌদি প্রিন্স মুহাম্মদ বিন সালমানকে নাকানি-চুবানি খাইয়ে ছাড়ছে। সেই সঙ্গে আমেরিকাকেও একহাত দেখে নেয়ার যে সুযোগ তিনি পেয়েছেন, সেটা ভদ্রভাবে কাজে লাগাচ্ছেন।

এখন প্রশ্ন হলো, এই ইস্যু থেকে এরদোয়ান বা তুরস্ক আসলে কী চায়? এটা দশ কথার প্রশ্ন, এককথায় এর উত্তর দেয়া যাবে না। আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক নানা প্রসঙ্গ এখানে জড়িয়ে আছে। তবে এই ইস্যুকে তাজা রাখতে রাখতে এরদোয়ান যে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বিরাট একটা দান খেলবেন, সেটা খোলা চোখেই বুঝা যাচ্ছে।

কয়েক দিন আগে ট্রাম্প সরকার সৌদি আরব থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার খসিয়েছে। যদিও আমেরিকান কর্মকর্তারা বলেছেন এ অর্থ সিরিয়াবিষয়ক নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যয় করা হবে, কিন্তু মানুষ কি আর এত বোকা আছে? কোথাকার টাকা কোথায় যায়-টাকার প্রশ্নে মানুষ অন্তত এত বোকামি করে না।

কিন্তু এরদোয়ান কী চাচ্ছেন? এরই মধ্যে সৌদি আরবের একাধিক রাষ্ট্রীয় ব্যক্তি তুরস্কে গিয়ে এরদোয়ানের সঙ্গে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে নানা তদবির করে এসেছেন। কিন্তু তাতেও গলেননি এরদোয়ান। তিনি দিনকে দিন সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুমকি-ধমকি দিয়েই যাচ্ছেন। গতকালও বলেছেন, খাশোগি হত্যার আরও ‘শক্ত’ তথ্য-প্রমাণ তার হাতে রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি কোনো তথ্য-প্রমাণ সংবাদমাধ্যমের সামনে প্রকাশ করেননি। আশ্চর্যের বিষয়ই বটে।

সুতরাং বুঝাই যাচ্ছে, তার হাতে তথ্য-প্রমাণ যা আছে তা তিনি ‘সঠিক সময়ের’ জন্য জমা রেখেছেন। হুমকি-ধমকি দিয়ে প্রিন্সকে বুঝাতে চেষ্টা করছেন-‘আমি যা বলি তাই শোনো, অন্যের কথা শুনলে সব ফাঁস করে দেবো!’

তিন

এই হত্যাকাণ্ড ইস্যু খোলাসা হতে হতেই মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বিবদমান ইস্যু সিরিয়া বিষয়ে বাতচিত করার জন্য প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ডেকে এনেছেন তার ভাই-বেরাদর রাশিয়ার পুতিন, জার্মানির অ্যাঙ্গেলা আর ফ্রান্সের ম্যাক্রনকে। তারা ইস্তাম্বুলে বসে সিরিয়া বিষয়ে বাতচিত করেছেন। ভুলেও আমেরিকাকে গোনার ধার ধারেননি।

সিরিয়া বিষয়ে পুতিন বরাবরই একরোখা। বাশার আল-আসাদের ল্যাঞ্জা তিনি কিছুতেই ছাড়বেন না। কিন্তু সিরিয়ায় যেভাবে অকাতরে মানুষ নিহত হচ্ছে এবং একের পর এক ভয়াবহ বিমান ও বোমা হামলায় দেশটি ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে, তাতে লাভ হচ্ছে না কারোরই। না আসাদের, না বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর। সুতরাং সিরিয়া বিষয়ে একটা সুরাহা সময়ের দাবি। এই খাশোগি ডামাডোলে তুরস্ক চাইবে আমেরিকাকে দূরে রেখে সিরিয়ায় একটি টেকসই যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে।

এরদোয়ানের মনোভাব অনেকটা এমন-সিরিয়ায় যুদ্ধবিরতি বা শান্তি আলোচনায় আমেরিকা বা সৌদি আরব কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এর ব্যত্যয় হলে যুবরাজের ঘটনা ফাঁস হয়ে যাবে।

সিরিয়া বিষয়ে তুরস্কের যথেষ্ট মাথাব্যথা রয়েছে। এক নম্বর কারণ, সিরিয়া তার প্রতিবেশী। এখানে যেকোনো ধরনের সশস্ত্র তৎপরতা তার দেশের জন্য হুমকির কারণ।

দুই নম্বর কারণ, সিরিয়া-ইরাক-তুরস্কের সীমান্তবর্তী কুর্দি অঞ্চলের দখল নিয়ে যোগসাজশ। এই কুর্দিরা অনেকদিন থেকে সিরিয়া ও তুরস্কের কিছু অঞ্চলকে নিজেদের আলাদা ভূখণ্ড দাবি করে সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়ে আসছে।

তিন নম্বর কারণ, বিশাল সংখ্যার শরণার্থী জায়গা নিয়েছে তুরস্কের বিভিন্ন শহরে। তাদের ব্যাপারেও যথেষ্ট উদ্বেগ কাজ করছে তুরস্কে।

রাশিয়ার কথায় সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদকে যদি আবার পুনস্থাপন করা যায় তাহলে তুরস্ক চাইবে এইসব বিবদমান বিষয়গুলো যেন তুরস্কের পক্ষে সুরাহা করা হয়। কারণ সিরিয়ার ৬০-৭০ শতাংশ ভূমি এখন বাশার নিয়ন্ত্রিত সেনাবাহিনীর হাতে। এ কারণে বাশারকেই আবার সিরিয়ার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা বানানো হচ্ছে। অথবা খুব শিগগির হয়তো সিরিয়ায় কোনো অন্তবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে আসাদকে বিজয়ী করা হবে।

এই হলো সিরিয়াবিষয়ক এরদোয়ান ও সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের ভূত-ভবিষ্যত। সুতরাং, জামাল খাশোগি মরিয়া প্রমাণ করিল যে, তার মরণ অনেকেরই শাপে বর হইয়া দেখা দিয়াছে।

 

চার

এর মধ্যে আরও দুটো খবর ঝালিয়ে নিতে পারেন। তাতে মধ্যপ্রাচ্যের প্যাঁচলাগা রাজনীতির হাকিকত কিছুটা হলেও মগজে তাশরিফ রাখবে।

গত শুক্রবার (২৬ অক্টোবর) ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু হঠাৎই সফর করেন মধ্যপ্রাচ্যের নিতান্ত গোবেচারা দেশ ওমান। তিনি ওমানের রাজধানী মাস্কাটে সে দেশের সুলতান কাবুস বিন সাইদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতশেষে আলাপ-সালাপ করেন, চা পান করে আবার বিদায় হন।

এটি একটি অভাবনীয় ঘটনা। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো মুসলিম দেশে ইহুদি প্রধানমন্ত্রীর আগমন খুবই বিরল। আবার এই ঘটনা ঘটল এমন সময় যখন পরদিনই বাহরাইনের রাজধানী সানাতে এ অঞ্চলের ‘১৪তম আন্তর্জাতিক ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ সম্মেলন শুরু হতে যাচ্ছিল। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল আমেরিকা এবং পশ্চিমা আরও কয়েকটি আমেরিকাপুষ্ট দেশের নিরাপত্তা প্রতিনিধিরা। ছিলেন সৌদির আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও।

আরেকটা খবর ইরানের। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণী সংসদীয় কমিটির সদস্য জাভেদ কারিমি ঘুদুসি ইরানের Moj news agency  নামের এক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ওমানের রাজধানী মাস্কাটে আমেরিকার সঙ্গে ইরানের ‘গোপন সমঝোতা’ চলমান।

এ দুটো খবরে ওমানের নাম বার বার উচ্চারিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ওমানের সম্পৃক্ততা নেই বললেই চলে। তবু ইসরাইল-ইরান-সৌদি বিষয়ে ওমানের সাম্প্রতিক সম্পৃক্ততা অবাক করেছে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অনেককেই। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে কি তবে নতুন কোনো মেরুকরণ হতে যাচ্ছে? ইরানও কি খাশোগি হত্যাকাণ্ডে ঘটনা থেকে ফায়দা তুলতে চাচ্ছে?

অবশ্য সিরিয়া ইস্যুতে ইরানের সম্পৃক্ততা একেবারে ফেলনা নয়। সম্পর্কটা রাজনৈতিক যেমন তেমনি ধর্মীয়। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ধর্মীয় মতাদর্শে শিয়া, আলাভি শিয়া। শিয়াদেরই একটি গ্রুপ। সেই হিসেবে বাশারের সঙ্গে ইরানের সুসম্পর্ক ঐতিহাসিক। সিরিয়ায় যুদ্ধরত অন্যান্য গ্রুপের অধিকাংশই সুন্নি মুসলিম দ্বারা পরিচালিত। এ কারণে সিরিয়ার এই গৃহযুদ্ধে ইরান ও বাশারের পূর্বের সখ্যতা আরও গাঢ় হয়েছে। নানা সময় তারা বাশারকে সাহায্য-সহযোগিতা জারি রেখেছে।

সুতরাং বর্তমানে আমেরিকাবিরোধী যেকোনো শিবিরে ইরান উদারচিত্তে অংশগ্রহণ করবে-এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। তাই আসন্ন সৌদি-কোনঠাসা অভিযানে ইরানও থাকবে তক্কে তক্কে। যেকোনো সুবিধায় সে-ও হাজির করতে পারে দেনা-পাওনার কূটনৈতিক ফিরিস্তি।

 

পাঁচ

তুরস্ক-সৌদি সম্পর্ক নিয়ে যে কোনো কথা বলার আগে আমি সবসময় জোর দেই ইতিহাসের প্রতি। খুব বেশি পুরোনো ইতিহাস নয়। একশো বছরের পুরোনো ইতিহাসের দিকে। ১৯২৩ সালে যখন ইস্তাম্বুলে একের পর এক খসে পড়ছিল উসমানি খেলাফতের রাজতোরণ, আর তাতে ইন্ধন যুগিয়ে যাচ্ছিল আরবের সৌদ ও আজিজ শাসকগোষ্ঠী; সেই ইতিহাস মোটেও ভোলেনি তুরস্ক।

খেলাফত হারানোর স্মৃতিচিহ্ন এত সহজে মুছে যাবে না তুরস্কের গতর থেকে। সৌদ গোষ্ঠীর বিশ্বাসঘাতকতাও তারা ভুলবে না সহসা। এ কারণে তুরস্ক ও সৌদি আরবের আঞ্চলিক দ্বন্দ্বের মধ্যে ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বটাও মনে রাখতে হবে।

আধুনিক জাতীয়তাবাদের জিকির তুলে কামাল আতাতুর্ক যে তুরস্ক গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, সেই জাতীয়তাবাদের ঠুনকো পোশাকের নিচে উসমানি খেলাফতের জাত্যাভিমান এত জলদি আড়াল হয়ে যায়নি। এরদোয়ান এসে ইস্তাম্বুলের খসে পড়া দালানকোঠা থেকে সেই জাত্যাভিমান আবার খুটে খুটে তুলে আনছেন। বিশ্ববাসীর কাছে উপস্থাপন করার কোশেশ করছেন উসমানি সাম্রাজ্যের নতুন এক ফিনিক্স তুরস্ক।

তাই জামাল খাশোগি ইস্যুতে ঘটমান দৃশ্যাবলি আরও কিছুদিন যে মঞ্চায়িত হবে, সেটা লিখে রাখতে পারেন।

বিজ্ঞাপন