গল্প : আতিকুলের ব্যাগে ছিল লাল চুড়ি

63

হাসান ইনাম  ।।  

রাত তিনটায় হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় আতিকুলের। চুপচাপ উঠে বসে। সবাই ঘুম। রাত পোহালেই ছুটি। আনন্দে মনের ভিতরে বাগবাকুম করে উঠে।

আস্তে আস্তে উঠে ট্রাঙ্কের কাছে যায় আতিকুল। পা ফেলে খুব সাবধানে। অন্ধকারে কারো পায়ের সাথে বেঁধে পড়লে ঝামেলা। বিছানা থেকে ট্রাঙ্কের দূরত্ব খুব বেশি না, কিন্তু আতিকুল সময় লাগিয়ে ফেলে অনেক।

ট্রাঙ্কের উপর কমলা কালারের ব্যাগ অন্ধকারের ভিতর জ্বলজ্বল করে। ব্যাগ গোছানো শেষ দুইদিন আগেই। সাবানের কেস, গোসলের মগ, খাওয়ার প্লেট, লবণের বাটি। সব ঢুকিয়েছে ব্যাগে। দুইদিন আগে যেদিন হাদীস পরীক্ষা ছিল।

চল্লিশ হাদীস মুখস্থ করিয়েছি তাওহিদ হুজুর। টাটকা মুখস্থ সব হাদীস আতিকুলের। পরীক্ষায় আট নম্বর আর চৌদ্দ নম্বর হাদীস জিজ্ঞেস করেছিল হুজুর। আতিকুল ঝরঝর করে বলে দিয়েছে।

পরীক্ষা শেষ হল জোহরের একটু আগে। নামাজের পর খাবারের দস্তরখানে সবার প্লেট আছে কিন্তু আতিকুলের প্লেট নেই। কত খোঁজাখুঁজি। কোথাও নেই। তখন বড় হুজুর এসে আতিকুলকে নিয়ে উস্তাদদের দস্তরখানে বসালেন। হুজুরদের পাশে গুটিসুটি মেরে খাবার খেলো ও।

রাতের খাবারেও নেই আতিকুলের প্লেট। আতিকুল চুপচাপ সিঁড়িতে বসে আছে। বড় হুজুর রাতে মাদরাসায় থাকেন না। উনি নেই তাই কেউ ডাকছেও না খাবার খেতে। সবার প্লেটে খাবাড় বাড়া প্রায় শেষ তখন আতিকুল উঠে গিয়ে ব্যাগ থেকে প্লেট বের করে। হুজুররা সবাই তো অবাক। ডাকা হয় আতিকুলকে- ‘কেন রেখেছিলে ব্যাগের ভিতর প্লেট?’

আতিকুল কিছুক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে বলে ‘বাইত যায়াম’। তারপর হেঁচকি তুলে কান্না শুরু করে। ছোট কারী সাব খাওয়া ছেড়ে কাছে টেনে নেন আতিকুলকে। মাথায় হাত বুলিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করেন। বলেন, ‘হুদা দুইডা দিনই। দুইডা দিন কষ্ট কর বাবা’।

দুই দিন শেষ। রাত পোহালেই ভোর। ভোর হলেই ছুটি। আতিকুলের ঢাকায় আসার খুব শখ ছিল। একসাথে বড় হওয়া শৈশব-বন্ধু রাসেল আর ফয়সাল পড়তো এই মাদরাসায়। ছুটিতে গেলে ওরা মাদরাসার গল্প শোনাতো, ঢাকার গল্প শোনাতো। সেইসব গল্প শুনে ঢাকা দেখার জন্য চকচক করতো আতিকুলের চোখ। কত্ত গাড়ী, বড় বড় দালান। রংয়ের ঢংয়ের মানুষ। মার্কেট।

আতিকুল গ্রামের মাদরাসায় পড়তো তখন। কায়দা শেষ করে আমপারা ধরেছে। এর ভিতর রমজান শুরু হল। রোজার ছুটিতে ফয়সাল আর রাসেল আরো গল্প শোনালো ঢাকার। ঢাকায় নাকি যুদ্ধ লাগে মাঝেমধ্যে। পুলিশ গুলি করে। ফয়সাল জানাল, ও নাকি হেলমেটপরা মানুষদের দেখছে মাদরাসার জানালা দিয়ে। হাতে বড় বড় রড। রাসেল তো বলে ওরা আসলে মানুষ না, জ্বিন। চেহারা ঢাকার জন্য হেলমেট পরে থাকে। মানুষ পেলেই রড দিয়ে মাথা ফাটিয়ে রক্ত খায়।

এসব শুনে ঢাকায় আসার আগ্রহ আরো বেড়ে যায় আতিকুলের। আতিকুলের মায়ের স্বপ্ন- ছেলে বিরাট বড় হুজুর হবে। মঞ্চে মঞ্চে বয়ান করবে। সাধারণ মানুষ আতিকুলের বয়ান শুনে চোখের পানি ঝরাবে। আর মহিলা প্যান্ডেলে বসে আতিকুলের মা বলবে ‘ অরে চিনুইন? বয়ান যে করতেছে হুজুর! তাইনে আমার ফুত।’

সবাই বড় বড় চোখ করে তাকাবে। গর্বে ফুলে উঠবে আতিকুলের মায়ের বুক। ঢাকায় আসার কথাবার্তা হঠাৎ করেই হয়। ফয়সালের মামা মাদরাসা সম্পর্কে জানায় আতিকুলের বড় ভাইকে। আতিকুলের ভাই কথা বলে ওর বাবার সাথে। সবাই রাজি। আর আতিকুল তো নিমরাজি হয়ে বসে আছে বহু আগে থেকেই।

বেঁকে আসে আতিকুলের মা। ছেলেকে এতদূর পাঠাবেন না কিছুতেই। রাতে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকে । ঢাকায় পাঠানোর কথা মনে আসতেই যেন পাজর ছিঁড়ে আসে। আতিকুল মানে না। ঈদের সাতদিন পর চলে আসে ফয়সাল আর রাসেলের সাথে। আতিকুলের বড় ভাই আসে সাথে। ভর্তি করিয়ে দিয়ে যায় মাদরাসায়।

প্রথম দুই দিন খুব ভালো কাটে ওর। কিন্তু তৃতীয় দিন থেকে আর মন টিকে না। মায়ের কথা মনে পড়ে। রাতে ঘুম আসে না। পড়ায় মন বসে না। সুরা বাইয়্যিনাহ’র বড় আয়াতটায় দম হারিয়ে ফেলে। এক শ্বাসে পড়তে পারে না। মনে পড়ে, আসার দিন মা মুখে আঁচল দিয়ে বার বার কান্না আড়াল করছিল। ব্যাগে ভরে দিচ্ছিল মুড়ির মোয়া আর বিস্কুট।

মার কথা মনে পড়লেই ট্রাঙ্ক খুলে বসে থাকে আতিকুল। মোয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। কুরবানির বন্ধে বাড়িতে গিয়ে সরাসরি মাকে বলে দেয় ও- আর ঢাকায় পড়বে না। মায়ের কাছে থাকবে। গ্রামেই পড়বে। ঠাস করে থাপ্পড় বসিয়ে দেয় আতিকুলের মা। কঠিন শাসন করে। দ্বিতীয় বার এই কথা উচ্চরণ করতে নিষেধ করে। বলে দেয়, ঢাকাতেই পড়তে হবে। অনেক বড় আলেম হতে হবে। তারপর আবার আঁচলে মুখ লুকান। মায়ের এমন দ্বিমুখী আচরণ দেখে ভয় পেয়ে যায় আতিকুল। বুঝে উঠতে পারে না কিছুই। মন খারাপ নিয়েই ছুটি কাটিয়ে ঢাকায় ফিরে।

প্রথম সাময়িক পরীক্ষার পর আবার ছুটি হবে। মাঝখানের দিনগুলো খুব দ্রুত যায়। মন খারাপ কমে যায় অনেকটা। দেখতে দেখতেই ছুটির দিন চলে আসে।

আজকে ছুটি। ব্যাগের ভিতর চুড়ির প্যাকেটটা ঠিকঠাক আছে কী-না দেখে নেয় আতিকুল। গতকাল বিকেলে ফুটপাত থেকে লাল চুড়ি কিনেছে ও। মায়ের জন্য। আতিকুলের ধারণা, কোনো কারণে মা রেগে আছে ওর উপর। চুড়ি দেখলে রাগ নিভে যাবে।

একটা সময় খুব চুড়ি পরতো মা। খাটের নিচে রাখা পুরনো ট্রাঙ্কে অনেক রংচটা চুড়ি দেখেছে ও। লাল টকটকে চুড়ি হাতে মাকে কেমন লাগবে-চিন্তা করে আতিকুল। ফিক করে হাসে আনমনেই।

আস্তে আস্তে আবার বিছানায় ফিরে আসে। ফজর হয় না কেন? ফজরের নামাজের পর বড় হুজুর বসান সবাইকে। তসবিহ পাঠ শেষে বয়ান করেন। বাবা-মার সাথে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে শিখিয়ে দেন। গিয়েই সালাম দিতে হবে। খেদমত করতে হবে। এতদিন খেদমত করার সুযোগ হয়নি, এই কয়দিন যেন অন্য কেউ খেদমত করার সুযোগ না পায়। তারপর আরো বলেন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের কথা। তেলাওয়াতের কথা।

দেরি সহ্য হয় না আতিকুলের। কোনো কথায় মন দিতে পারে না। মন চলে গেছে বাড়িতে। ময়মনসিংয়ের প্রায় পনেরো-ষোলোজন ছাত্র। সবাই একসাথে যাবে। ফয়সাল আর রাসেল তো আছেই।

সব হুজুরের সঙ্গে মুসাফা করে ওদের ছোট্ট দলটা মাদরাসার গেট দিয়ে বের হয়। হাঁটতে থাকে। রাস্তা পার হয়ে ওইপার যেতে হবে। ওইপার থেকে উঠতে হবে মহাখালীর বাসে। মহাখালী থেকে এনা পরিবহনে সোজা ময়মনসিংহ।

ব্যাগের উপর দিয়ে চুড়ির প্যাকেটের অস্তিত্ব বুঝার চেষ্টা করে আতিকুল। রাস্তা পার হতে হবে। সবাই সারিবেঁধে দাঁড়ায়। একটু সামনেই ফুটওভার ব্রিজ। ওদিকে কেউ তাকায় না। উঠতে-নামতে ঝামেলা। অযাথা সময় নষ্ট। সবাই পার হওয়া শুরু করে রাস্তা। ব্যাগের উপরে হাত বুলাতে বুলাতে রাস্তা পার হয় আতিকুল।

হঠাৎ মনে হয় চুড়ির প্যাকেটটা নেই। থেমে যায় রাস্তার মাঝখানে। ঠিক সেই সময় একটা বাস এসে ধাক্কা মারে আতিকুলকে। ছিঁটকে যায় আতিকুল। দূরে গিয়ে পড়ে আতিকুলের কমলা রংয়ের ব্যাগ। ব্যাগ ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে চুড়ির প্যাকেট। গোল গোল চুড়ি ছড়িয়ে পড়ে রাস্তায়।

চুকচুক করে রক্তক্ষরণ হয় আতিকুলের শরীর থেকে। চুড়ি দেখে স্বস্তিতে চোখ বন্ধ করে ফেলে আতিকুল। দেখতে পায় মায়ের মুখ। মা লাল টুকটুকে চুড়ি পরে পাগলের মতো দৌড়ে আসছে ওর দিকে।