প্রফেসর হজরতের সঙ্গে আরেকদিন আরেক বেলা

48

মুহাম্মাদ আদম আলী  ।।  

চার

রাতে ছুটি মিলেছিল অনেক রাতে। তারপর রাত বেড়ে আরও দীর্ঘ হয়েছে। ফজরের পর না ঘুমিয়ে পারিনি। চোখ কেবল লেগে এসেছে অমনি প্রফেসর হজর হামীদুর রহমানের ফোন। আজ আমার অনেক কাজ। একটু পরেই মানিকনগর রওনা হতে হবে। সেখানে একটা জরুরী মিটিং আছে।  অন্যদিন ফজরের পর  স্ত্রী এক কাপ চা দেন। আজ দেননি। গতকাল সারাদিন অনেক মেহমানদারি করেছেন। রাতেও ভালো ঘুম হয়নি। এখন ক্লান্তিতে উঠতে পারছেন না। চা পেলে ফজরের পর ঘণ্টা দুয়েক কাজ করা যায়। চা না পেলে ঘুমই কাজ হয়ে ওঠে। তাই ঘুমানোর চেষ্টা করছিলাম। হজরতের ফোন সব উলট পালট করে দিল।

‘কি ঘুমাচ্ছিলে?’

‘না স্যার, জেগেই আছি।’ ঘুমানোর কথা বললে ফোন রেখে দিতে পারেন। তাই যা মনে এল বললাম।

‘তুমি আমাদের গতকাল নাস্তা খাওয়াতে চেয়েছিলে। খাইনি। আজ আমরা তোমার বাসায় নাস্তা খেতে আসব। আমি অবশ্য রোযা। আমার সঙ্গীরা খাবে । ঠিক আছে?’

‘জি স্যার।’

‘তোমার বিবি কি সুস্থ?’

‘জি স্যার।’

স্ত্রী ঘুমাচ্ছে। তাকে এখনো কিছু জানানো হয়নি। কাল থেকেই আমি যা চাচ্ছি, তার বিপরীত সব ঘটছে। আজ হজরতকে দাওয়াত দেইনি। দিতেও চাইনি। তিনি নিজেই আসছেন। এই সৌভাগ্যকে হাতে ঠেলে সরিয়ে দেওয়া যায় না। স্ত্রীও নিশ্চয়ই মেনে নিবে।

সময় ঠিক হলো সকাল আটটায় হজরত আসবেন। আমি স্ত্রীকে সব বললাম। আল্লাহর শোকর তিনি সানন্দে রাজী হলেন। জানতে চাইলেন কত জন আসবে। আমার কাছে এর জবাব ছিল না। সকালে মাদরাসায় অনেকে থাকে। কাউকে না করা যায় না। ১০-১৫ জনের ব্যবস্থা করতে বললাম। তিনি রান্না ঘরে চলে গেলেন। আমি কম্পিউটারে বসলাম। কাল রাতে হজরত অহ অঢ়ঢ়বধষ ঃড় ঈড়সসড়হ ঝবহংব বইটির নাম দেওয়ার কারণ হিসেবে যা বলেছিলেন, তা ইংরেজি করতে হবে। কথা সব বোঝা যায়নি। তবু লিখতে বসলাম। হজরত বাসায় এলে যদি দেখে দেন, তহলে বইটি তাড়াতাড়ি ছাপানো যাবে। আমি লিখলাম :

Allah has given me an opportunity to travel to USA in 2012. During that trip, I bought a book named `I Love My Mom’ from a bookstore at Atlanta. In this book, everything was mentioned to give thanks to Mom for her many good deeds to her children. But there was no mention of God to whom one must give thanks for providing him such a mom. This is a lack of common sense if someone actually utilizes his intellect to think about his own creation.

As everything is made of something or by somebody, the universe also has to be a creator. We, as human beings, cannot sustain in this world without oxygen. The world is equipped with the same percentage of oxygen everywhere for the benefit of Mankind and this is done by God Himself. So, naturally one should give thanks to this Creator. But we, as usual, fail to use our common sense in this regard. Thus the name of this book has been kept An Appeal to Common Sense.

এরকম কিছু কথাই হয়তো বলেছিলেন। লিখতে বেশি সময় লাগেনি। এখনো আটটা বাজতে ঘণ্টাখানেক বাকি। মাদরাসায় যাওয়া দরকার। সেখানে নিশ্চয়ই অনেকে বসে আছে। তাদের সবাইকে দাওয়াত দিতে হবে। সংখ্যাটা জানা দরকার। বিবিকে জানাতে হবে। আমি মাদরাসার দিকে গেলাম।

আগের পর্ব : প্রফেসর হজরতের সঙ্গে একদিন সারাদিন

পাঁচ

হজরত বাসায় এলেন। সঙ্গে মাত্র ছয়জন। আজ মাদরাসায় তেমন কেউ ছিল না। খবরও পায়নি। কোনোমতে খবর পেলেই খবর হয়ে যেত। তবে নাস্তার জন্য কেউই মরিয়া নয়। সবাই হজরতের সঙ্গে থাকতে চায়।  এখন এ সুযোগ সহজে পাওয়া যায় না।

হজরত ঘরে ঢুকেই বিছানায় শুয়ে পড়লেন। মাদরাসা থেকে আমার বাসা বেশি দূরে নয়। এতটুকুতে বেশি ক্লান্ত হওয়া কথা না। তার ক্লান্তি তো আর একদিনের না। সারাজীবনের। জীবনভর যে কষ্ট করে যাচ্ছেন, তাতে আরেক জীবন বিশ্রামের জন্য লাগবে। সুতরাং একটু সময় পেলেই দেহটাকে একটু আরাম দিতে চান। দেহের হকে দেনা পড়েছে অনেক। হজরতের ছেলেরা এখন এই দাবীতে সোচ্চার। তবু তাকে থামানো যাচ্ছে না। সারাদেশ সফর করে বেড়াচ্ছেন।

সবাইকে নাস্তা দেওয়া হয়েছে। হজরত পাশের ঘরে শুয়ে আছেন। ঘুমাতে পারছেন না। একজন ডিস্টার্ব করছে। ভদ্রলোক আমার খুব পরিচিত। হজরতের সঙ্গে আসেননি। পরে এসে হাজির হয়েছেন। কিছু বলতেও পারছি না। তিনি হজরতের দিকে মুখ বাড়িয়ে কথা বলে যাচ্ছেন। হজরত চোখ বন্ধ করে আছেন। আমি তাকে ডাকলাম।

‘ভাইজান, হজরতকে একটু ঘুমাতে দিন।’

‘হজরতের সঙ্গে আমার একটি জরুরী পরামর্শ ছিল।’

‘এভাবে পরামর্শ করা ঠিক না। পরামর্শের জন্য আলাদা সময় চেয়ে নেওয়া উচিত ছিল। তিনি যদি এখানে এসে পরামর্শ করতে বলতেন, তাহলে তা ঠিক ছিল। বুযুর্গদের ফাও পেলেই আমাদের অনেক পরামর্শ করতে ইচ্ছে করে। পরামর্শের জন্য তাদের কাছে যাওয়ার সময় হয় না।’

ভদ্রলোক আমার কথায় খুশি হতে পারলেন না। নাস্তা খেতে চলে গেলেন।

নাস্তা শেষ হলো। হজরতও উঠে বসলেন। আমার ছোট ছেলের বয়স পাঁচ বছর। হজরত তাকে কায়দার সবক দিবেন। আগেই বলা ছিল। এতদিন সুযোগ হয়নি। আজ বলতেই হজরত রাজী হয়ে গেলেন। তিনি অযু করে দু-রাকাত নামায পড়লেন। তারপর আমার ছেলেকে সবক দিলেন। দুআ করলেন।

হজরত হয়তো বের হয়ে যেতেন। আমি তার সামনে আমার ড্রাফ্ট করা কাগজ মেলে ধরলাম।

‘এটি কী”

‘স্যার, গতকাল আপনি যেসব কথা বলেছিলেন, তার একটা ড্রাফ্ট করেছি।’

‘দেখি।’

তিনি দেখলেন। এই প্রথম তিনি আমার ইংরেজির প্রশংসা করলেন। বললেন, ‘ভালো লিখেছ।’ তারপর কলম চাইলেন। একটি লাল কলম এগিয়ে দিলাম। একটু পর পৃষ্ঠাটিতে আমার কালো লেখা খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে গেল। তিনি এখন সহজে হাতে লিখতে পারেন না। লেখার অক্ষর আস্তে আস্তে ছোট হয়ে যায়। মুখে বলছেন, আর কষ্ট করে লিখছেন। আমি কথাগুলো রেকর্ড করে নিলাম। শব্দ না বুঝলেও যেন কথা শুনে লেখা যায়। তিনি লিখলেন :

Allah has given me an opportunity to travel to USA in 2012. During that trip, I bought a book named `I Love My Mom’ from a bookstore at Atlanta. In this book, everything was mentioned to give thanks to Mom for her many good deeds to her children. But there was no mention of God to whom one must give thanks for providing him such a mom. The world behaves in the same way.

As everything is made of something or by somebody, the universe also has to have a creator. For example, we as human beings cannot sustain in this world without Oxygen. The Creator of oxygen should have been thanked for His bounties. `Common Sense’ demands it.

আলহামদুলিল্লাহ, বড় একটি কাজ হয়ে গেল। কয়েকমাসের কাজ এক মুহূর্তেই হয়ে গেল। অবশ্য ছেলেকে সবক দিয়েছেন, সেটি এর চেয়েও বড় কাজ। আল্লাহ তাকে কবুল করুন।

হজরত চলে গেলেন। সকাল দশটা বেজে গেছে। আমাকেও বের হতে হবে। আবার কবে এমন সময় আসবে, কে জানে!