প্রফেসর হজরতের সঙ্গে একদিন সারাদিন

76

মুহাম্মদ আদম আলী ।।  

এক

আজ অনেকদিন পর প্রফেসর হজরত তার গাড়িতে উঠতে বললেন। এশার নামাজের পর কোথাও যাচ্ছিলেন। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোথায় যাবেন স্যার?’ আমার যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। একটা ধান্ধা আছে মাথায়। ধান্ধাটা নিয়ে জটিলতায় আছি। জট কেবলই পাকাচ্ছে। খুলছে না।

হজরত বললেন, ‘তোমার খালাম্মাকে আনতে যাচ্ছি। কমান্ডার হাসানের বাসায়। সেক্টর চারে। গাড়িতে ওঠ।’

আজ সকাল থেকেই হজরতের দেখা পাচ্ছি। তিনি আজ কোথাও যাননি। উত্তরায় কাটিয়েছেন। সকাল থেকে তার কাছে অনেকগুলো আবদার করেছি। একটাও রাখেননি। যা চেয়েছি, তার উল্টোটা বলেছেন। সকালে বলেছিলাম, ‘আমার বাসায় নাস্তা করেন।’ তিনি বললেন, ‘আজ তোমার বাসায় নাস্তা করব না।’

দুপুরে বললাম, ‘আমার এক বন্ধু আপনার মেহমান হয়েছে। তাকে দুপুরে আমার বাসায় নিয়ে যাই?’ তিনি বললেন, ‘না। সে তোমার সঙ্গে খাবে না। আমার সঙ্গে খাবে।’

বিকেলে গিয়েও তার দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। তিনিই দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। অনেকক্ষণ কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে সরে পড়েছি। সন্ধ্যায় একটা মাহফিলে দাওয়াত ছিল। মাসখানেক আগেই বলে রেখেছিল। উত্তরখানে। সেখানে গিয়েছিলাম। পরে শুনেছি, হজরত আমার খোঁজ করেছিলেন। মনটা খারাপ হয়ে গেল মুহূর্তেই। বলে আসা উচিত ছিল। এখন এশার পর এজন্য আবার ছুটে এসেছি।

হজরত আমাকে সামনের সিটে বসতে বললেন। বসলাম। একসময় এ সিটটা আমার জন্যই বরাদ্দ থাকত। সিটটা হারিয়েছে অনেক দিন হয়ে গেল। গাড়ি স্টার্ট দিতেই হজরত বললেন, ‘সূরা বাকারার শুরু থেকে পড়।’ হজরতের পাশে একজন হাফেজ সাহেব ছিলেন। আমি ভাবলাম, তাকে বুঝি বলেছেন। না, তিনি আমাকেই পড়তে বলেছেন। ইয়াদ ভালো না থাকলে হজরতের সামনে পড়া মুশকিল। আমি পেছন ফিরে হাফেজ সাহেবের দিকে তাকালাম। এরপর হয়তো তাকে বলবেন। আমার নিরবতা দেখে হজরত নিজেই পড়া শুরু করলেন। প্রায় দুই পৃষ্ঠা তিলাওয়াত করলেন। অনেকদিন হজরতের তিলাওয়াত শোনা হয়নি। তার পড়ার একটা সুর আছে। বড় দরদী সেই পড়া!

 

দুই

পথের সময় ফুরিয়ে গেল। হাসানের বাসায় ড্রইং রুম বেশ বড়। হজরত খালাম্মাকে বের হতে বলে নিজে সোফায় শোয়ার চেষ্টা করছেন। পা ভাঁজ করতে পারছেন না। লম্বাও করতেও পারছেন না। বড় বাসায় ড্রইং রুমে কেউ খাট রাখে না। সোফায় আর কতটুকু জায়গা! তিনি অনেক কষ্ট করে শরীরটাকে হেলিয়ে দিলেন। পা পুরোটাই সোফার বাইরে থাকল। তিনি চোখ বন্ধ করার আগেই খালাম্মা রেডি হয়ে গেলেন। দরজায় দাঁড়িয়ে হজরতকে ডাকছেন। আমরা সোফায় বসার সুযোগ পেলাম না।

প্রফেসর হজরত হামীদুর রহমান

হজরত খালাম্মাকে দেখেই বললেন, ‘আজ এত তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে গেলেন?’ মহিলাদের একটু দেরি হয়ই। হজরত তা-ই আশা করেছিলেন। এই ফাঁকে একটু বিশ্রাম নিবেন। বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ কই? সারাদিন-সারারাত কিছু না কিছু কাজ থাকেই। ঘুমানোর সময় খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এই শেষ বয়সেও তার ব্যস্ততা কমেনি। খালাম্মা লিফটে উঠেছেন। হজরত লিফটের বাইরে। এসময় তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি চা খেয়েছ?’

‘হ্যাঁ।’

‘তুমি চা খেলে আমরা চা খেতে পারব না?’

হাসানের ছেলে সামনেই ছিল। তাকে বললেন, ‘যাও, তোমার মাকে জিজ্ঞেস কর, আমাদের কি চা খাওয়ানো হবে?’

ছেলে দৌড়ে তার মায়ের কাছে গেল এবং চায়ের দাওয়াত নিয়ে এল। এখন হজরত খালাম্মাকে বললেন, ‘লিফট থেকে নামো। আমরা চা খেয়ে নেই।’

‘আজ আর চা খেতে হবে না। চল, বাসায় চল।’

‘না। এটা হতে পারে না। তুমি চা খাবে আর আমরা না খেয়ে থাকব—এটা হবে না। জলদি নেমে আসো।’

সুখী পরিবার। খুনসুটি হচ্ছে। কথার অভিব্যক্তি তো আর লেখা যায় না। খালাম্মা লিফট থেকে নেমে আবার ঘরে ঢুকলেন। হজরত ড্রইংরুমে আবার শোয়ার চেষ্টা করছেন। চা খাওয়ার চেয়ে তার এখন একটু বিশ্রাম দরকার। সম্ভবত এজন্যই আবার ফিরে আসা। বাসায় গেলে কোন কাজে লেগে যাবেন, ঠিক নেই। বিশ্রাম আর হবে না। হাসানের ছেলে হজরতকে পাশের ঘরে নিয়ে গেল। হজরতকে এবার খাটে শুইয়ে দিল।

 

তিন

একটা বই রিপ্রিন্ট করতে হবে। প্রফেসর হজরতের ইংরেজি বয়ান সংকলন; An Appeal to Common Sense এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে। তখনই হজরতকে একটা বই হাদিয়া দিয়েছিলাম। এতদিনে সেখানে অনেক দাগ পড়ার কথা। এজন্য আমি সেই বইটি চেয়েছি। হজরত দিবেন বলেছেন। সকাল থেকে সেই বইটি পাওয়ার ধান্ধায় আছি। এখনো দেওয়ার সুযোগ পাননি। তবে বইটি নিয়ে কয়েকবার কথা হয়েছে। এখন বিছানায় শুতে শুতে বললেন, ‘বইটির নাম তো আমিই দিয়েছিলাম, তাই না?’

‘জি স্যার।’

‘এই নামটা আমি কেন দিলাম?’

বইয়ের প্রচ্ছদ

হজরতের এই কথা শুনে আমি নার্ভাস হয়ে গেলাম। নামটা সুন্দর। যথার্থও। এখন যদি তিনি নাম পাল্টে দেন, তাহলে প্রচ্ছদ বাতিল। ছাপাতে আবার কতদিন লাগবে কে জানে। মনে হলো, কিছু না বলে ছাপিয়ে ফেললেই ভালো হতো। এখন আর পেছনে ফেরার সুযোগ নেই। একটু পর হজরত চোখ বন্ধ করেই বলে উঠলেন, ‘নাম এটাই থাকবে। তবে কেন এই নামকরণ করা হয়েছে তা বলে দেওয়া দরকার।’

এবার আমি হালে পানি পেলাম। কিন্তু মনের শংকা কাটল না। এই লেখা পেতে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে। ইংরেজিতে লিখতে হবে। হজরতের ইংরেজির কাছে আমাদের যোগ্যতা শূন্য। হজরত আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘কাগজ-কলম দাও।’

হাসানের ছেলে কাগজ-কলম এগিয়ে দিল। হজরত শোয়া অবস্থায়ই কলমটা কোনোমতে ধরলেন। খাতাটা ধরতে পারলেন না। ঘুমিয়ে গেলেন। আমরা পাশে বসে আছি। একটু পর চা আসবে। এই ফাঁকে একটু ঘুম। ডিস্টার্ব করতে ইচ্ছে করল না। কিন্তু তিনি নিজেই কথা বলে উঠলেন, An Appeal to Common Sense… আবার ঘুম। হাতে কলমটা এখনো ধরা আছে। হাসানের ‎‎ছেলে খাতাটা মেলে রেখেছে। আমি চাতকের মতো ‎‎চেয়ে আছি। যদি কিছু লেখেন! না, তিনি লিখলেন না। ‎কথা বললেন, ‘আমি বাংলায় বলি। তুমি সেগুলো ‎ইংরেজি করে নিও।’ হজরত চোখ বন্ধ করেই কিছু কথা ‎বললেন। সেসব কথার শুরু বোঝা গেলেও শেষ বোঝা ‎‎গেল না। ‎

একটু পর চা দেওয়া হলো। হজরত উঠে বসলেন। চায়ের সঙ্গে ‎বিস্কুট। হজরত চা দিয়ে ভিজিয়ে বিস্কুট মুখে দিয়ে ‎বললেন, ‘আমার এভাবে বিস্কুট খেতে ভালো লাগে। ‎তবে চায়ের মধ্যে ভিজিয়েও বিস্কুট চাবাতে পারি না। ‎‎দাঁতই তো নেই।’ ‎

আমি তখন লেখার কথা ভুলে গেলাম। গল্প শুরু ‎করলাম। হাসানকে নিয়ে সোহবতের গল্প বইয়ে একটা গল্প ‎আছে। হজরত আমার লেখা বইগুলো সব খুটে খুটে ‎পড়েননি। মাঝে মাঝে পড়েছেন। এই গল্পটাও হয়তো ‎পড়েননি। আমি গল্পটা শুরু থেকে বললাম। দেয়ালে ‎টাঙানো নারীর ছবি ছেঁড়ার গল্প। এটি শুনে হজরত এত ‎হাসলেন, আমি আর এগুতে পারছিলাম না। তারপর ‎আরেকটি গল্প শুরু করলাম :‎

‎নেভিতে আমার এক সিও ছিলেন। কমান্ডার পদবির। ‎সমুদ্রে গেলে তাকে মাগরিবের পর সূরা ওয়াকিয়া ‎‎শোনাতাম। তিনি বলতেন, সিনিয়র অফিসার হয়ে ‎ইসলামের জন্য অনেক কাজ করবেন। তারপর তিনি ‎সিনিয়র হলেন। কমডোর (বিগ্রেডিয়ার জেনারেল) ‎হলেন। তখন তার সঙ্গে একদিন মসজিদে দেখা। ‎জামাত দাঁড়িয়ে গেছে। তিনিও জামাতে শরিক ‎হয়েছেন। এসময় তার মোবাইল বেজে ওঠে। তিনি ‎পকেট থেকে মোবাইল বের করে বলেন, ‘এ-ই আমি নামাজে।’ ‎

এটুকু বলতেই হজরত হেসে উঠলেন। হাসি থামছে না। ‎কতদিন এমন নির্মল হাসি দেখিনি! ‎

(চলবে ইনশাআল্লাহ)