উত্তর গেটের সিঁড়ি : মুঠো মুঠো স্মৃতির জোনাকি

49

আতাউর রহমান খসরু ।।  

না, এখানে ইট বিছানো এই মেঝে ছিল না। ছিল না ডান ও বাম পাশের স্থাপনাও। এখানে ছিল এক টুকরো সবুজ উঠোন, সার সার ছায়াবীথি। রাস্তার ওপাড়ে চোখ ধাঁধানো কোনো ভবন ছিল না। ছিল না রকমারি খাবারের রঙিন পসরা। এখানে ছিল মানুষের হৃদয় মোহনা। এই যে সিঁড়ি–তিন দিক থেকে মিশেছে পবিত্র ঘরে–এখানেই হতো আত্মার সম্মিলন। তেজ হারিয়ে রোদ যখন কোমল হয়ে উঠতো, ঠিক তখন থেকে এখানে শুরু হতো দ্বীনপ্রাণ শতজনের আনাগোনা। বায়তুল মোকাররমের সেই সিঁড়ি এভাবেই আমাদের জীবনের আঙিনা হয়ে উঠতো।

ক্লান্ত পথিক, অপেক্ষমাণ বন্ধু, আড্ডায় মুখর যুবক আর স্মৃতি-হাতড়ানো পৌঢ়–কে আসতো না এখানে? মুঠোয় মুঠোয় পার করে দিতো বিকেল-সন্ধ্যা-রাত। সন্ধ্যার নরম আলোয় আরও সবুজ হয়ে উঠতো সবুজ ঘাস, উত্তরা বাতাসে সতেজ হতো প্রাণ।

আমরা জানতাম না, তিনি আমাদের বেশি ভালোবাসতেন না সিঁড়িটাকেই। আমরা ভালোবাসতাম তার চা আর চায়ের সাথে মুড়ির মোয়া।

আমরা যারা লিখতে শুরু করেছিলাম–উচ্ছ্বল তরুণ প্রাণ–আমরা বসতাম সিঁড়ির পশ্চিম দিকটায়। সিঁড়ির পূর্ব ও উত্তর দিকটায়ও বসেছি অনেক। তবে পশ্চিমমুখো সিঁড়িটাই আমাদের বেশি পছন্দের ছিল। চাওয়ালা করিম চাচাও পশ্চিমের সিঁড়িতে উদাস হয়ে বসে থাকতেন। আমরা জানতাম না, তিনি আমাদের বেশি ভালোবাসতেন না সিঁড়িটাকেই। আমরা ভালোবাসতাম তার চা আর চায়ের সাথে মুড়ির মোয়া।

আমাদের আড্ডা-চর্চায় প্রাণ যোগাতো শিল্প, সাহিত্য ও দ্বীনের নানা অনুষঙ্গ। মধুর তর্কজুড়ে থাকতো রাজনীতির টাটকা খবর। কিন্তু আমাদের পাশ দিয়ে বয়ে যেতো পুরো সমাজ। সময়ের স্রোত। রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার, পেশাগত জীবনের জটিলতা কিংবা ব্যক্তিগত ভালোলাগা-মন্দলাগা –সবকিছুই অপ্রাসঙ্গিক ছিলো গুচ্ছ গুচ্ছ আড্ডাগুলোয়।

গল্প-আড্ডার ফাঁকে কখনো-সখনো পেছন ফিরেই চকিত হতাম আমরা। না,কোনো ভয় বা শঙ্কায় নয়। ঘাড় ফিরিয়ে দেখতাম ত্রি-সিঁড়ির মোহনায় এই সমতল জায়গাটায় বসেছে তারার মেলা। সমকালের লেখালেখি, শিক্ষকতা কিংবা রাজনীতির আকাশে তারকাপুঞ্জের সমাগম আমাদের ঠিক পেছনে। আমরা আলো নিতাম তাদের থেকে।

তার ঠিক উল্টো দিকটায় পূর্বের সিঁড়িতে বসে থাকতো কিছু ভবঘুরে যুবক। তাদের বাম পাশেই বিশ্রাম নিতো শ্রমজীবী-পেশাজীবী মানুষ। সাধারণ মুসল্লি, এলাকার অবসর মুরব্বিরা থাকতেন সবার মাঝে। সব শ্রেণির মানুষের কাছেই প্রিয় ছিল এই পবিত্র অঙ্গণ। বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটের সিঁড়ি।

এই যে বললাম, এখানে তারার মেলা বসতো। তাদের সাথে সাথে কিন্তু থাকতো আলোর মিছিল। ঈমান-ইসলামের দাবিতে মেহরাব হয়ে রাস্তায় নেমে আসতো মিছিলের ধারা। বুকে হিম্মত, মুখে দ্বীন বিজয়ের স্লোগান। সে এক দৃশ্য ছিল বটে! পবিত্র ধ্বনিতে মুখরিত সে মিছিলে সরব থাকতাম আমরাও। মিছিল শেষে প্রদীপ্ত যুবক, প্রত্যয়ী পৌঢ় আর ঘামে ভেজা অবুঝ শিশু–আমরা সবাই আবার মিলিত হতাম এই ত্রি-মোহনায়।

islamtimes24
বায়তুল মুকাররম মসজিদের দখিন গেটের ভেতর দৃশ্য

আজকের এই দৃষ্টিনন্দন জাতীয় মসজিদের সুরম্য সৌন্দর্য্য তখনও ছিল। তবে প্রখর ছিল প্রাণের উচ্ছ্বাস, চেতনার দীপ্তি ও ভালোবাসার স্নিগ্ধ-সবুজ পরশ। বায়তুল মোকাররমের শোভা-সৌন্দর্যে আমরা বরাবরের মতোই মোহিত। আমাদের চোখের সামনেই পরিণত হলো আমাদের এই গরবের ধন। জাতীয় মসজিদ। আকাশছোঁয়া শ্বেত গম্বুজ, শ্বেত পাথরের বিস্তৃত প্রাঙ্গণ, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ভবন যা কিছু দেখে বায়তুল মোকাররমকে দর্শকের কাছে সত্যিকার জাতীয় মসজিদ বলে মনে হয়–আমাদের কাছে তা-ই অনিন্দ্য। তবে আমাদের সেই স্মৃতি, সেই সব বিকেল ও সন্ধ্যার উচ্চতা অনেক বেশি।

এখনো অনেকে আসে বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটেরে সেই সিঁড়িতে, সেই আড্ডায় আর অবসরে। দীর্ঘ পথচলার পর একটু জিরিয়ে নিতে। এখনও সেখানে আসে পথিক, বসে অপেক্ষা করে বন্ধুরা। শুনেছি, শহুরে আলোর ঝলকানিতে সেখানে কমেছে আলোর মিছিল, চেতনাদীপ্ত স্লোগান।

কম কি! তবুও তো বেঁচে আছে আমাদের সেই প্রাঙ্গণ যৌবন পেরিয়ে আসা ম্লান আমাদের মতোই। বেঁচে থাকুক, ভালো থাকুক আমাদের সেই সান্ধ্য-রাতের মধুর চত্ত্বরটি। উত্তর গেটের সিঁড়ি! তোমার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের অনেক বিকেল-সন্ধ্যা, আবেগ-আনন্দ, অশ্রু-সাধ।