ইতিহাসের ঝাণ্ডাদার : ঢাকাইয়া কুট্টি

হাসান ইনাম  ।।  

‘কুট্টি’ শব্দটা কানে আসতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে ধবধবে সাদা লুঙ্গি পরিহিত আর মুখভর্তি পান চিবোনো মুখচ্ছবি। কানে বাজে ‘আব্বে হালায়, ছমছ্যা কি।’ ঢাকার আদি অধিবাসী এই কুট্টিদের আসল পরিচয় কী? এরা কি আসলেই ঢাকার আদি অধিবাসী?

বিজ্ঞাপন

নাজির হোসেন তাঁর ‘কিংবদন্তির ঢাকা’ গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেন ‘মোগল আমলে ঢাকাবাসীদের মধ্যে যারা মোঘল শাহীর অধীনে চাকরি করতেন অথবা জমিদার কিংবা ব্যবসা সংক্রান্ত ব্যাপারে জড়িত ছিলেন তারা নিজেদের উঁচু স্তরের লোক ভাবতেন। তৎকালে যন্ত্রের কোনো প্রচলন ছিল না। মানুষকে নিজেদের চাহিদা মেটাবার সব রকম উপকরণ হাতেই তৈরী করতে হতো। এইসব পেশাজীবীদের অনেকেই ধান কুটতো, যব কুটতো, ডাল কুটতো, সুরকি কুটতো, ইট কুটতো অর্থাৎ যে কোনো ধরনের কুটার কাজ যারা করতেন, তারা ছিলেন খুবই দরিদ্র। …অন্যদিকে তারা কুটার কাজ করতেন বলে শহরের উঁচু স্তরের লোকেরা এইসব কোটার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের ‘কুটিয়াল’  বলতো। সাধারণভাবে এদের কুট্টি বলেই ডাকতেন।

এই বিষয়ে বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ড. রঙ্গলাল সেন ‘রাজধানী ঢাকার ৪০০ বছর ও উত্তরকাল’ প্রথম খণ্ডে তাঁর ‘মুঘল আমল থেকে রাজধানী ঢাকার সমাজ ও সমাজ কাঠামো’ প্রবন্ধে এস এম তাইফুর রচিত Glimpses of old Dacca গ্রন্থের আলোকে উল্লেখ করেন আদি ঢাকার চারটি পেশাজীবী গোষ্ঠীর কথা। কুট্টি, খোসবাস কিংবা সুখবাস, বসাক এবং শাঁখারি।

সামাজিকভাবে কুট্টিদের উদ্ভব সম্পর্কে তিনি উল্লেখ করেন, ‘রাজধানী ঢাকার শহুরে সম্প্রদায়ে একটি সনাতন সামাজিক বর্গ হিসেবে কুট্টিদের উদ্ভবের মূলে ছিল ১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে সংঘটিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ১৭৬২ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে ঢাকায় সংঘটিত প্রচণ্ড ভূমিকম্পের ফলে বিরাট সংখ্যক লোক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। কিন্তু বিশেষ করে, ১৭৬৯—১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দে বারংবার সংঘটিত গুরুতর দুর্ভিক্ষের ফলে কুট্টি বলে কথিত এক শ্রেণীর শ্রমিক ব্যাপক সংখ্যায় ঢাকার মধ্যাঞ্চল থেকে এসে শহরের ধোলাইখাল এলাকার কতক অংশে বসতি স্থাপন করে। এদের প্রধান কাজ ছিল ধান কুটে চাল বের করা এবং যে সকল জমিদার ঢাকায় বসবাস করতে আসতেন, তাদের দালান-কোঠা তৈরীর জন্য প্রয়োজনীয় ইট ভেঙ্গে দেওয়া।’

একই প্রবন্ধে অধ্যাপক রঙ্গলাল সেন হাফিজা খাতুন রচিত Dhakaiyas on the Move গ্রন্থের বিবরণ উল্লেখ করেন ,  ‘আঠারো শতকের মধ্যভাগ থেকে পূর্ববঙ্গে চাল একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাণিজ্যের পণ্যে পরিণত হয়। ঢাকা ধান-চাল ব্যবসার বিরাট এক কেন্দ্র হয়ে ওঠে। চাল রপ্তানিকারকরা সকলেই ছিল মাড়োয়ারি ও ভারতের মধ্যাঞ্চলের ব্যবসায়ী। তারা পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জেলার অভ্যন্তর থেকে ধান-চাল সংগ্রহ করত এবং তারা ধান ভানার কাজে স্থানীয় বিপুল সংখ্যক শ্রমিক নিয়োগ করত। এসব ধান ভানার লোকেরা যারা ঢাকা শহরের পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে আসত তারাই কুট্টি নামে অভিহিত হয়। ‘

ইসলাম টাইমস
পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবার বাখরখনি

কুট্টিরা প্রথমে ধোলাইখালে বসতি গড়লেও পরবর্তীতে তাঁতিবাজার, শাঁখারিবাজার, পাটুয়াটুলি, বাংলাবাজার, ফরাশগঞ্জ, গ্লোরিয়া, লক্ষ্মীবাজার, নারিন্দা, মৈশুন্দি, মদনমোহন বসাক রোড, নবাবপুর, ওয়ারী, বনগ্রাম, হাটখোলা, টিকাটুলি, কায়েতটুলি, নবাবগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে বংশপরম্পরায় এখনও টিকে আছে তাঁরা। পুরনো ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক কুট্টিদের পড়ালেখার প্রতি তেমন খেয়াল দেখা যায় না। বরং এক প্রকার অনীহাই আছে বলা যায়। এই অনীহা জন্মানোর পিছনেও আছে ইতিহাস। নবাব গনি তাঁর পুত্র নবাব আহসানউল্লাহর কাছে লেখা একটি চিঠিতে কুট্টিদের কথা পাওয়া যায়। সেই চিঠির কথা উল্লেখ করেন ড.মুনতাসীর মামুন তাঁর ‘ঢাকা সমগ্র’ গ্রন্থে। নবাব লিখেন , ‘ঢাকার কুট্টিরা প্রজা নয় কিন্তু তাদের প্রজার মতো ব্যবহার করতে হবে খান্দানের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য। এসব লোক যদি লেখাপড়া শিখে বাস্তব অবস্থা জানতে পারে তাহলে খান্দানের নেতৃত্বের পরিকল্পনা ছাড়তে হবে। তাদের অন্যভাবে টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করা যেতে পারে। কিন্তু স্কুলের ব্যবস্থা যেন না করা হয়।’

কুট্টিরা চালাক-চতুর, কিন্তু ব্যবহারে খুবই অমায়িক। অতিথিদের আপ্যায়ন বা খাতিরদারিতে পুরান ঢাকার লোকেরা দেশে সর্বশ্রেষ্ঠ। দিনভর আড্ডা দেওয়া সরল মনের এই কুট্টিরা এখনও টিকে আছে পুরনো ঢাকায়। সভ্য ঢাকার সংস্কৃতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে লালন করে যাচ্ছে নিজস্ব সংস্কৃতি।

সহজ সরল মনের এই ঢাকাইয়া কুট্টিরা অনেক ধর্মভীরু। প্রতি মহল্লায় এক দুটি করে মসজিদ আছে। এদের কারণেই ঢাকা মসজিদের নগরী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ঢাকার অন্য অধিবাসীদের চেয়ে কুট্টিরা অধিক রক্ষণশীল। পুরনো ঢাকার এই অধিবাসীরা বৃটিশ আমল থেকেই দ্বীনি প্রতিষ্ঠানসমূহের পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে। ধর্মের ব্যাপারে তাদের রয়েছে আলাদা অনুভূতি- সহানুভূতি।

বিজ্ঞাপন