পিরোজপুরের পথে (এক)

31

সাদ আবদুল্লাহ মামুন ।। ধুকপুক করা বুক নিয়ে ছুটছি। গুলিস্তান থেকে সদরঘাটের দিকে। কিন্তু কোনোভাবেই আমাদের ছাড়ছে না রাজধানীর বেহায়া যানজট। সঙ্গ না ছাড়ার বায়না ধরেছে যেন-বা আজ। এদিকে মাগরিব হতে বেশি দেরি নেই। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় আমাদের লঞ্চটি ছেড়ে দেবে। আগে থেকেই আমাদের টিকেট কাটা। লঞ্চটি না পেলে আমাদের সফর নাস্তি ঘটারও আশঙ্কা।

ইমাম আবু হানিফা রহ. রিসার্চ সেন্টার। পিরোজপুর জেলা সদরের একটি দীনি মাদরাসা। মাদরাসাটির একটি বৈশিষ্ট্য, দীনি বিষয়ের বিভিন্ন ফনের একজন মেহমানকে প্রতি মাসে দাওয়াত করা হয়। ছাত্রদের সামনে সারা দিনব্যাপী বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করার ব্যবস্থা থাকে। এ রকম একটি দাওয়াতে সাহিত্যিক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ সাহেব আমন্ত্রিত অতিথি। আমাকে তিনি সফরসঙ্গী করেছেন।

গত ১৮ই ফেব্রুয়ারির ঘটনা। রোববার। মুহতারাম শরীফ মুহাম্মদ দক্ষিণবঙ্গের জেলা-শহর পিরোজপুরের সফরে সঙ্গে নিয়েছেন এ অভাজনকে। দুপুর দুটায় তিনি পল্লবীর বাসা থেকে বের হন। আমি মিরপুর ১২ মুসলিম বাজার মাদরাসা থেকে। মিরপুর সাড়ে এগারো থেকে বাসে উঠি। সদরঘাট থেকে আমাদের লঞ্চ ছাড়বে সন্ধ্যায়।

আড়াই ঘণ্টা লেগে গেছে পল্টন পৌঁছতেই। তার পর বাস আর আগায় না। বসে আছি তো আছিই। শেষ পর্যন্ত পৌঁছতে পারব তো! ধীরে ধীরে আশঙ্কা উৎকণ্ঠায় পরিণত। আমরা বাস থেকে নেমে পড়লাম। নেমে হাঁটতে থাকলাম। সামনে গিয়ে একটা বাসে উঠলাম। কিছুদূর গিয়ে সেটাকেও ছাড়তে হলো। জ্যাম। কিছুদূর হেঁটে ফাঁকা দেখে আবার রিকশায়। শেষ পর্যন্ত দুই বাস আর তিন রিকশায় গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পৌঁছলাম। পেয়ে গেলাম আমাদের লঞ্চটি। এ যেন পানির সফরের আগেই স্থলের সফরের এক লম্বা অভিযান!

লঞ্চে গিয়ে উঠলাম। কেবিনে ব্যাগপত্র গুছিয়ে বসলাম। সাড়ে ছয়টায় লঞ্চ ছেড়ে দিলো। ছোট্ট কেবিনের বারান্দায় খোলা বাতাস। দূরে – কাছে বহু লঞ্চের রঙিন বাতি। যেন বাতি আর রঙের অপূর্ব মেলা। মাগরিবের পর কিছু সময় পড়াশোনা। কিতাবাদি ও বইপত্র। ওযু করার সময় পানির বিষয়টি লঞ্চে খেয়াল রাখতে হয়। কখনো কখনো ঢাকার কাছাকাছি থাকার সময় লঞ্চের ব্যবহার করা পানিটা হয় খুব ঘোলাটে। কিছুটা দুর্গন্ধযুক্তও। লঞ্চ ঢাকা থেকে সরে কিছুটা সামনে এগুলে স্বচ্ছ ও পরিষ্কার পানি পাওয়া যায়। রাত নয়টার দিকে এশার নামায আদায় করলাম। শরীফ মুহাম্মদ সাহেব বাসা থেকে খাবার নিয়ে এসেছেন। মুরগি দিয়ে শুকনো খিচুড়ি। মজাদার রান্না। আমরা খেয়েদেয়ে চা পান করে আবার বিছানায় কাত। মাঝারি মানের ছোট্ট একটা রুমের মতো। দুই পাশে দুই বিছানা। পড়াশোনার জন্য বই হাতে নানা কসরত করতে লাগলাম। চলমান লঞ্চের পাশে অন্ধকার। নদীর পানির দূর সীমানা। বারবার বারান্দায় গিয়ে বসতে ইচ্ছে জাগে।

মৃদুমন্দ বাতাস। ঠান্ডা ঠান্ডা । রাত সাড়ে দশটা। আমাদের লঞ্চটি কিছু সময়ের জন্য চাঁদপুর ঘাটে ভিড়ল। টার্মিনালে বড় করে লেখা- ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর। দেখেই মনটা আমার কেমন করে উঠল। এ পথের অধিকাংশ লঞ্চই চাঁদপুরে ঘাট দেয়। লঞ্চের সফর আমার কাছে পুরনো। চাঁদপুরে আমাদের বাড়ি। ঢাকা থেকে চাঁদপুর সাড়ে তিন ঘণ্টার পথ। লঞ্চেই বেশিরভাগ যাতায়াত। তারপরও অন্যরকম ভালো লাগছে যেন আজ। সফর আমার কাছে আনন্দদায়ক। কিছুটা রোমাঞ্চকর। অজানাকে জানা। অদেখাকে দেখা। সফরটা আরামদায়ক হলে তো কথাই নেই। কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের লঞ্চটি আবার চলতে শুরু করল।

শেষরাতে ঘাট হলো বরিশালে। তারপর বেশকটি ছোট ছোট ঘাট। সাড়ে আটটায় গিয়ে থামল হুলারহাট। আমরা এখানে নামলাম। এগিয়ে নিতে এলেন ইমাম আবু হানিফা রহ. রিসার্চ সেন্টারের তরুণ উসতাদ মাওলানা মাহমুদ ও মাওলানা মাসরুর। ঘাট থেকে মাদরাসার দূরত্ব দুই-তিন কিলোমিটার। শহরে ঢুকার করার আগেই সিও মোড় থেকে বাঁ দিকে। বাইপাস সড়কের পাশে। একটি অটোতে করে ধীরলয়ে আমরা মাদরাসায় গিয়ে পৌঁলাম।

দুটি গেট পেরিয়ে মাদরাসার মাঠ। মাদরাসার একটি কিন্ডারগার্ডেন শাখা রয়েছে- নুরে মদিনা। ফাইভ পর্যন্ত সিলেবাস। সঙ্গে জরুরি ইসলামি শিক্ষা। ছেলে-মেয়েদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা শাখা। আলাদা ভবন। মেয়েদের জন্য মহিলা শিক্ষিকা। নাযেরা ও হিফযখানা রয়েছে। মেয়েদের জন্য আছে মহিলা মাদরাসা। বড় দুটি মাদরাসা ভবন। ছোট ছোট দুটি বিল্ডিং। নামাজের জন্য একটি প্রশস্ত জায়গা। পরিচ্ছন্নতা ও ব্যবস্থাপনা ভালো লাগলো।

আমরা মেহমানখানায় প্রবেশ করলাম। নাশতার জন্য দস্তরখান তৈরি। হাতমুখ ধুয়ে দসতরখানে বসলাম। এ সময় মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ সাহেব একজন মেহমানের সঙ্গে পরিচিত হন। মুফতি আবদুল বাতেন কাসেমি। ঢাকার মিরপুর খাদেমুল ইসলাম মাদরাসার শাইখুল হাদিস এবং উত্তরার মসজিদে আয়শা রা.-এর খতিব। এদিকে তিনি এক মাহফিলে এসেছেন। এখানে মাহফিল শেষে বিশ্রাম করছেন। এ মাদরাসার উস্তাদ মাওলানা মাহমুদ তাঁর ছাত্র।(চলবে)